

তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অ্যান্টি-শিপ মিসাইল (জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র) ‘আতমাকা’ তার সক্ষমতার এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। গত ২৭ মার্চ তুর্কি নৌবাহিনীর করভেট টিসিজি বুর্গাজাদা থেকে উৎক্ষেপণ করা এই মিসাইলটি সমুদ্র থেকে স্থলভাগের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রকেটসান এই সফল পরীক্ষার কথা নিশ্চিত করেছে।
আতমাকা মূলত একটি অ্যান্টি-শিপ বা জাহাজ-বিধ্বংসী মিসাইল হিসেবে পরিচিত হলেও, এই পরীক্ষার মাধ্যমে এটি প্রমাণ করল যে এটি এখন স্থলভাগে আক্রমণ চালাতেও সমান পারদর্শী। এর ফলে তুর্কি নৌবাহিনী এখন কেবল সমুদ্রের শত্রু জাহাজই নয়, বরং উপকূলীয় রাডার স্টেশন, লজিস্টিক সেন্টার এবং শত্রুঘাঁটিতেও দূরপাল্লা থেকে আঘাত হানতে পারবে।
রকেটসানের তথ্য অনুযায়ী, আতমাকা মিসাইলটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর পাল্লা ২৫০ কিলোমিটারের বেশি। মিসাইলটির ওজন ৭৫০ কিলোগ্রামের কম, এর মধ্যে ২২০ কেজি ওজনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ওয়ারহেড রয়েছে।
এতে রয়েছে উন্নত জিপিএস, ইনার্শিয়াল নেভিগেশন এবং টার্মিনাল গাইডেন্সের জন্য অ্যাক্টিভ আরএফ সিকার। বিশেষত্ব হলো এটি রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম এবং অত্যন্ত নিচ দিয়ে উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এছাড়া মাঝপথে লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন বা মিশন বাতিল করার সক্ষমতাও এতে রয়েছে।
এই পরীক্ষার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ইঞ্জিন। মিসাইলটিতে তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি কেটিজে-৩২০০এ টার্বোজেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, যা তৈরি করেছে কালে জেট ইঞ্জিন। বিদেশি ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব ইঞ্জিন ব্যবহারের ফলে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প এখন আরও বেশি স্বনির্ভর ও শক্তিশালী।
ক্ষুদ্র জাহাজে বিশাল শক্তি, যে জাহাজ থেকে মিসাইলটি ছোড়া হয়েছে, সেই টিসিজি বুর্গাজাদা একটি মিড-লেভেলের ‘আদা-ক্লাস’ করভেট। সাধারণত বিশাল আকৃতির ডেস্ট্রয়ার বা ক্রুজার থেকে এ ধরনের ল্যান্ড-অ্যাটাক মিসাইল ছোড়া হয়। কিন্তু তুরস্ক প্রমাণ করেছে যে, তাদের ছোট ও মাঝারি আকারের যুদ্ধজাহাজগুলোও এখন দূরপাল্লার নিখুঁত হামলা চালাতে সক্ষম। একে আধুনিক নৌ-বিদ্যায় ‘ডিস্ট্রিবিউটেড লিথালিটি’ বা ‘বিক্ষিপ্ত মারণক্ষমতা’ বলা হয়, যা শত্রুর জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন করে তোলে।
তুরস্ক বর্তমানে কৃষ্ণ সাগর, এজিয়ান সাগর এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে কাজ করছে। আতমাকা মিসাইলের এই বহুমুখী ব্যবহার তুরস্কের ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ (মাভি ভাতান) নীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া ন্যাটোর সদস্য দেশ হিসেবে তুরস্কের এই সক্ষমতা জোটের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আতমাকা মিসাইলের এই সফল পরীক্ষা তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে এক নতুন যুগের সূচনা করল। এটি কেবল একটি অস্ত্রের পরীক্ষা নয়, বরং তুরস্কের প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং আধুনিক নৌ-শক্তির এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।
আপনার মতামত লিখুন :