

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো আলো ছড়ানোর বাতিঘর। কিন্তু যশোরের চৌগাছা উপজেলার কমলাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে জ্বলছে অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার এক কালো আগুন। ১৯৯২-১৯৯৩ সেশনে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে জেঁকে বসে আছেন জনাব মোঃ আব্দুল আলীম। বিগত তিন দশক ধরে ক্ষমতার দাপট, রাজনৈতিক চাটুকারিতা আর দুর্নীতির একচ্ছত্র ‘রামরাজত্ব’ কায়েম করে রেখেছেন তিনি।
বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে তার কোনো অনিয়ম নিয়ে কেউ কখনো টু শব্দ করার সাহস পায়নি। কিন্তু পাপের ঘড়া যে একদিন পূর্ণ হয়, তার প্রমাণ মিলল গত ২১ জুন ২০২৬ তারিখে।
গত ২১ জুন, কমলাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে পরিদর্শনে যান স্থানীয় সাহসী দুই সাংবাদিক, রাসেল ও জাহিদ। সেখানে গিয়ে তারা যা দেখলেন, তা একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষাব্যবস্থায় এক চরম লজ্জাজনক অধ্যায়। মাসের ২২ তারিখ হয়ে গেলেও প্রধান শিক্ষক আব্দুল আলীমের হাজিরা খাতায় কোনো স্বাক্ষর ছিল না! খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৫-৭ বছর ধরে তিনি মাসে মাত্র একদিন স্কুলে আসেন এবং এসে পুরো মাসের স্বাক্ষর একসাথে করে সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বেতন তুলে নেন।
সাংবাদিকদের আসার খবর পেয়ে প্রধান শিক্ষক তড়িঘড়ি করে স্কুলে ছুটে আসেন এবং হাজিরা খাতা কেড়ে নিয়ে অন্য রুমে গিয়ে স্বাক্ষর করা শুরু করেন। সচেতন সাংবাদিক রাসেল যখন এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, তখন প্রধান শিক্ষক ও তার পালিত বাহিনী সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয় এবং এক অপ্রীতিকর ও হুমকিমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই ঘটনার একটি ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। পুরো এলাকাজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন—যে দেশে বর্তমান সরকার শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে একজন প্রধান শিক্ষক কীভাবে এমন ধৃষ্টতা দেখান?
এলাকার সচেতন নাগরিকরা যখনই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেছেন, তখনই প্রধান শিক্ষক তার প্রভাবশালী আত্মীয়-স্বজন ও রাজনৈতিক নেতাদের ডেকে এনে সাধারণ মানুষকে অপমান ও হুমকি-ধমকি দিয়েছেন। তিনি বরাবরই চরম দাম্ভিকতার সাথে বলে থাকেন:
“আমার চাকুরীর বয়স আর মাত্র দুই বছর আছে। আমি সারাজীবন এভাবেই চলে আসছি, কেউ আমার কিছু করতে পারেনি আর কেউ পারবেও না।”
এমনকি উপজেলা প্রশাসন থেকে কেউ পরিদর্শনে আসার আগে প্রধান শিক্ষককে গোপনে খবর দেওয়া হতো, আর তখনই কেবল তিনি বিদ্যালয়ে তার “মূল্যবান পায়ের ধূলি” দিতেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়েরই একজন শিক্ষক এই নির্মম সত্য নিশ্চিত করেছেন।
আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে রয়েছে কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ। সরকারি অনুদানের টাকা লোপাট, নামে-বেনামে ভুয়া ভাউচার করে আলমারি ভরে রাখা এবং এনটিআরসিএ (NTRCA)-এর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাছ থেকেও কৌশলে কমিশন আদায়ের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর চেয়েও বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে। কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নাম করে রওশানারা খাতুন নামের এক অসহায় মেয়ের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষের কথা থাকলেও তিনি ৪,৯০,০০০/- (চার লক্ষ নব্বই হাজার) টাকা ঘুষ হিসেবে এই প্রধান শিক্ষক জনাব আব্দুল আলীমের হাতেই দেন। রওশানারা চাকরিতে যোগদান করলেও দীর্ঘ দুই বছরেও তার নাম সরকারি কাগজপত্রে তুলতে ব্যর্থ হন এই প্রধান শিক্ষক। বাধ্য হয়ে রওশানারা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের চাকরিতে চলে যান। বর্তমানে তিনি যশোর সদরের আরিফপুর আনোয়ার হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। পরবর্তীতে তিনি অনেকবার প্রধান শিক্ষকের কাছে তার টাকা ফেরত চাইলেও আজ এক যুগ (১২ বছর) পার হয়ে গেলেও সেই অসহায় মেয়ের জমানো টাকা আর ফেরত দেননি আব্দুল আলীম।
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আব্দুল আলীমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে, প্রশ্ন শুনেই তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে সংযোগটি কেটে দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের এই অন্তহীন দুর্নীতির পেছনে রয়েছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জনাব এস এম বজলুর রশিদের প্রচ্ছন্ন আশ্রয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক সাংবাদিক আক্ষেপ করে বলেন, “শিক্ষা অফিসার বজলুর রশিদ বাবু সব জানেন, তিনি মূলত আব্দুল আলীম দ্বারা ‘ম্যানেজড’। তা না হলে একজন প্রধান শিক্ষকের এত বড় দুর্নীতি করার সাহস হয় কীভাবে?”
শিক্ষা অফিসার বজলুর রশিদের বিরুদ্ধেও রয়েছে কর্তব্যে অবহেলার পাহাড়সম অভিযোগ। উপজেলা সদর ইউনিয়নের প্রশাসক নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে কাজ থাকুক আর না থাকুক, তিনি সর্বদা ইউনিয়ন পরিষদেই পড়ে থাকেন। দুপুর ২টার আগে তাকে তার মূল দাপ্তরিক কার্যালয় শিক্ষা অফিসে পাওয়াই যায় না। বিদ্যালয় পরিদর্শনের তো প্রশ্নই আসে না। শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত “আয়-রোজগার” নিয়ে ব্যস্ত থাকা এই কর্মকর্তার কারণে উপজেলার শিক্ষাব্যবস্থা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তিনি এক বছর হলো এই উপজেলায় পদায়ন হয়েছেন। যেখানে এলাকার সাধারণ মানুষ পর্যন্ত বিষয়টি জানে, সেখানে তিনি কীভাবে জানেন না—তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
প্রধান শিক্ষক আব্দুল আলীমের দুর্নীতি এবং নিজের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে কথা হয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস এম বজলুর রশিদের সাথে। তিনি বলেন, “আমি এই বিষয় সম্পর্কে কিছুই জানি না। কেউ আমাকে লিখিত বা মৌখিকভাবে কিছুই বলেনি। তবে আপনি যেহেতু বললেন, আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।” অন্যদিকে তার নিজের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি সরাসরি দাবি করেন, “এই বিষয়গুলো মোটেও সত্য নয়।”
আপনার মতামত লিখুন :