

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
বিদেশ সফরের প্রকৃত সাফল্য দেশে ফিরে আসার দিন নির্ধারিত হয় না। সময়ই তার আসল বিচারক। কোনো সফরের মূল্য কেবল কতটি চুক্তি হলো, কতটি সমঝোতা স্মারক সই হলো বা কতটি ঘোষণা এলো, এসব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
কূটনীতির অনেক অর্জন দৃশ্যমান হতে সময় লাগে। কখনও তা বাণিজ্যে প্রতিফলিত হয়, কখনও বিনিয়োগে, কখনও আন্তর্জাতিক আস্থায়, আবার কখনও একটি দেশের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া নিছক একটি কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি সুস্পষ্ট দর্শনের প্রতিফলন রয়েছে। সেই দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তা নতুন বাস্তবতায় সম্প্রসারিত করেন। আর আজকের পরিবর্তিত বিশ্বে তারেক রহমান সেই ধারাবাহিকতাকে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন, এমন ইঙ্গিতই মিলছে।
অনেকেই প্রশ্ন করছেন, প্রথম বিদেশ সফরের জন্য কেন চীন ও মালয়েশিয়া? কেন অন্য কোনো দেশ নয়? এর উত্তর খুঁজতে হলে কয়েক দশক পেছনে তাকাতে হবে।
স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতি ছিল দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত। সেই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না রেখে বহুমাত্রিক করার উদ্যোগ নেন। তাঁর কূটনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ যেখানে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত হবে, সেখানেই সম্পর্ক আরও গভীর করা। এই নীতির অংশ হিসেবেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন গতি পায়। একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
মালয়েশিয়া তখন দ্রুত শিল্পায়নের পথে এগোচ্ছে। চীনও ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট জিয়া হয়তো আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতির চিত্র দেখেননি। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে কেবল রাজনৈতিক বন্ধুত্ব নয়, অর্থনৈতিক অংশীদারও খুঁজতে হবে।
খালেদা জিয়ার সময় সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়তে থাকে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজারে পরিণত হয়। হাজার হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্রও উন্মুক্ত হতে থাকে।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই এসেছে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফর। তবে এটিকে কেবল অতীতের পুনরাবৃত্তি বললে ভুল হবে। কারণ বিশ্ব এখন অনেক বদলে গেছে।
আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতা শুধু কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারে নয়; বরং শিল্প, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দক্ষ জনশক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়েও। ফলে বাংলাদেশের কূটনীতিকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।
এ কারণেই চীন সফরের গুরুত্ব শুধু নতুন সহযোগিতা ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় তাৎপর্য হলো—বাংলাদেশ নিজেকে শুধু উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। যদি এই প্রচেষ্টা বাস্তবে রূপ পায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে নিম্নমূল্যের শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্যের শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের দিকে এগোতে পারে।
একইভাবে মালয়েশিয়া সফরের তাৎপর্যও শুধু শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ নয়। বহু বছর ধরে দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান আলোচ্য ছিল কর্মী পাঠানো। কিন্তু এখন আলোচনায় দক্ষ মানবসম্পদ, বিনিয়োগ, কৃষি, হালাল শিল্প, প্রযুক্তি এবং শিল্প সহযোগিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের চরিত্রই বদলে যেতে পারে।
এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির ভাষা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অতীতে উন্নয়ন সহযোগিতা বা অবকাঠামো নির্মাণ ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এখন গুরুত্ব পাচ্ছে বিনিয়োগ, বাজার, প্রযুক্তি, শিল্প স্থানান্তর এবং উৎপাদন। এই পরিবর্তন কেবল শব্দের পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনৈতিক কৌশলেরও পরিবর্তন।
অনেকে বিদেশ সফরের মূল্যায়ন করেন কতটি চুক্তি হলো, কত ডলারের প্রতিশ্রুতি এল বা কতটি সমঝোতা স্মারক সই হলো, সেগুলো দিয়ে। কিন্তু কূটনীতির ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। অনেক বড় ঘোষণাই বাস্তবায়নের অভাবে ইতিহাসে হারিয়ে গেছে। আবার অনেক ছোট উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে একটি দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে। তাই সফরের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে ঘোষণার ওপর নয়, বাস্তবায়নের ওপর।
চীন ও মালয়েশিয়া, দুটি দেশই বাংলাদেশের জন্য কেবল বন্ধু রাষ্ট্র নয়; তারা অর্থনৈতিক রূপান্তরের সম্ভাব্য অংশীদার। একটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনশীল অর্থনীতি, অন্যটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সফল শিল্পোন্নত রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সামনে যখন মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়িয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ, তখন এই দুই দেশের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
জিয়াউর রহমান যে বহুমাত্রিক কূটনীতির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং খালেদা জিয়া যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করেছিলেন, তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফর সেই ধারাবাহিকতাকে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা দেওয়ার একটি প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাস্তবায়নের অগ্রগতির ভিত্তিতে।
চীন ও মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে-এমন ইঙ্গিত মিলেছে। সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে প্রতিশ্রুত উদ্যোগের বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের প্রবাহ, বাণিজ্যের বিস্তার, প্রযুক্তি সহযোগিতার অগ্রগতি এবং দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায়, তার ওপর।
চীন ও মালয়েশিয়া সফরকে তাই কেবল একটি কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে নতুন বাস্তবতায় অভিযোজিত করার একটি প্রচেষ্টা এবং জিয়া পরিবারের বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতার নতুন অধ্যায়। এখন প্রয়োজন ঘোষণাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। কারণ কূটনীতির সাফল্য ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
আপনার মতামত লিখুন :