নেপালে বেড়েই চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : আগস্ট ২৮, ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ /
নেপালে বেড়েই চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা

হিমালয় সংলগ্ন নেপাল এবং চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বত সীমান্তে প্রলয়ঙ্কারী আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও চরম ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। বুধবার সকালে হঠাৎ নেমে আসা কাদা, পাথর ও পানির তীব্র স্রোতে নদীর আশপাশের গ্রাম, পথঘাট ও অবকাঠামো পুরোপুরি ধুয়েমুছে গেছে।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মর্মান্তিক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯০ জনে এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১৩০০ জনেরও বেশি মানুষ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার তৎপরতার মধ্যেই পাহাড়ি নদীতে কৃত্রিমভাবে গঠিত হ্রদ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় নতুন করে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই আকস্মিক বিপর্যয়ের পরপরই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রতিবেশী দেশগুলো দুর্গত এলাকাগুলোতে দ্রুত ত্রাণ পাঠানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বহু জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

নেপালের বাগমতি প্রদেশের রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সীমান্তের লেন্দে খোলা ও ভোটে কোশি নদীতে হঠাৎ এই জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়। পানি এত দ্রুত এবং তীব্র গতিতে পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে আসে যে লোকজনের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

বন্যায় ধ্বংস হয়ে গেছে অন্তত ২৫ মাইল দীর্ঘ সড়কপথ এবং বেশ কয়েকটি সেতু। এছাড়া পাহাড়ি নদীর ওপর নির্মিত একাধিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো অঞ্চল এখন বিদ্যুৎহীন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। নুয়াকোটের সোলি গ্রামের মতো বহু জনপদ মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে গেছে, যেখানে অসংখ্য ঘরবাড়ি কাদামাটির নিচে চাপা পড়েছে। মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে মূল দুর্যোগস্থল থেকে বহু দূরে; নেপালের চিতওয়ান জেলা সংলগ্ন নদী অববাহিকায়।

হিমালয়ের দুর্গম এই অঞ্চলটি ট্র্যাকিং ও তীর্থযাত্রার জন্য বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে এক বিশাল সংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। ভারতের পবিত্র কৈলাশ মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া কয়েক শত তীর্থযাত্রী এই ঝড়ের কবলে পড়েছেন। ভারত ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা নিখোঁজ তালিকার মধ্যে রয়েছেন। নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে অন্তত এক শতাধিক আহত মানুষকে উদ্ধার করে কাঠমান্ডুতে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পকে এই ঘটনার অনুঘটক মনে করা হলেও পরবর্তীতে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বিষয়টি স্পষ্ট করে। তারা জানায়, কোনো ভূমিকম্প হয়নি; বরং উচ্চ হিমালয়ের প্রায় ৫২০০ মিটার উঁচুতে থাকা হিমবাহ বা গ্লেসিয়ারের একটি বিরাট অংশ ভেঙে নদী উপত্যকায় আছড়ে পড়েছিল।

প্রায় ১.২ কিলোমিটার ওপর থেকে বিশালাকার বরফখণ্ড ও বিশাল পরিমাণ পাথর নিচে খসে পড়ায় যে প্রচণ্ড কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল, তাতেই প্রথমিক ভুমিকম্পের সংকেত পেয়েছিল ভূ-কম্পন মাপক যন্ত্র। তীব্র গরম ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পাহাড়ি বরফ ও পারমাফ্রস্টের বাঁধন আলগা হয়ে যাওয়ায় এই ভয়াবহ ধস নেমেছে বলে আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

এক দুর্যোগের ক্ষত সামলে ওঠার আগেই নতুন এক চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে। পলি, পাথর ও কাদার স্তূপ নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে দেওয়ায় নতুন একটি কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।

চীনের আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছে, ক্রমাগত পানি বেড়ে যাওয়ায় এই বাঁধটি যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়তে পারে। হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে আরও একবার তীব্র বেগে পানির স্রোত নিচের গ্রামগুলোর ওপর আছড়ে পড়বে, যা দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। উদ্ধারকারী দল ও বাসিন্দাদের অবিলম্বে ওই নদীর আশপাশের বিপজ্জনক এলাকা থেকে সরে যাওয়ার জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার এই বন্যাকে ‘অত্যন্ত ভয়াবহ ও মর্মান্তিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জরুরি চিকিৎসা, খাবার পানি ও আশ্রয়ের সুবিধার্থে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন।

চীন ও নেপাল সীমান্ত জুড়ে তল্লাশি জোরদার করতে সেনা হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারী ডগ স্কোয়াড নিয়োজিত করা হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী নেপালকে সম্ভাব্য সব ধরনের সামরিক ও মানবিক সাহায্য পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যও আগাম বন্যা পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে পাহাড়ি সড়কগুলো পুরোপুরি ধসে যাওয়ায় দুর্গম অঞ্চলে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান