

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কয়েকদিন আগে আপনারা দেখেছেন চট্টগ্রামে চীনকে বিরাট একটা জায়গা দিয়েছি। চীন থেকে আমি ঘুরে এসেছি। তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। চট্টগ্রামে (আনোয়ারা) তারা কয়েকশ’ মিল-কারখানা তৈরি করবে। সমগ্র চট্টগ্রামের মানুষ ইনশাআল্লাহ সেখানে কাজ করার সুযোগ পাবে। তার ফলে একদিকে বেকার সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে, একই সাথে বহু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করব। সেই মুদ্রা দিয়ে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করব, বাংলাদেশের মানুষের শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলব। দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে শ্রমিকের হাতে রূপান্তর করবো। দেশে ঘটবে শিল্প বিপ্লব।
গতকাল রোববার দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্র সৈকতে বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন। সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএনপি নেতা মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা আবদুল করিম।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি হেলিকপ্টারে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ চলমান বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প কার্যক্রম (মিডা) স্বচক্ষে পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি জাপানের কাশিমা বন্দরের একই আদলে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী বহু সুবিধাসম্পন্ন গভীর সমুদ্রবন্দর সম্পর্কে আগ্রহ ব্যক্ত করেন। তাছাড়া উপকূলের দ্বীপ ও চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমিতে স্বল্প খরচে সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশে সুলভে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের দিক-নির্দেশনা দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের।
প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে গতকাল হেলিকপ্টারযোগে মাতারবাড়ী সফরে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, আজ আমি মাতারবাড়ী গিয়েছিলাম। মাতারবাড়ীতে পুরো দেখে আসলাম। মীরসরাই থেকে শুরু করে সমগ্র অঞ্চল হেলিকপ্টারে আমি দেখেছি। কেন দেখেছি? কারণ এই যে আমাদের সামনে বিশাল সমুদ্র, এটি হচ্ছে বাংলাদেশের সম্পদ। এই সমুদ্রের মালিক হচ্ছে এই বাংলাদেশের জনগণ। এই সমুদ্রকে কীভাবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের মানুষের জীবন ব্যবস্থা উন্নত করা যায়, কীভাবে আমরা মীরসরাই থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত বিভিন্ন মিল ফ্যাক্টরি স্থাপন করার মাধ্যমে এদেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারব, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যবস্থা করতে পারব সেই পরিকল্পনা কীভাবে গ্রহণ করা যায় তার জন্য আজ মাতারবাড়ী গিয়েছিলাম।
তিনি বলেন, এ দেশের মানুষের জন্য যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়। এর জন্য যদি দেশি বিদেশি বিনিয়োগকারী যারা আছে তাদের উৎসাহিত করে মিল ফ্যাক্টরি স্থাপন করতে হয় তাহলে তার পূর্বশর্ত হচ্ছে দেশে শান্তি শৃঙ্খলা থাকতে হবে। দেশে বিশৃঙ্খলা থাকলে চলবে না। আপনার এলাকায় কোনো গ-গোল হলে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। কারণ গ-গোলে যাতে ব্যবসার ক্ষতি না হয়। ঠিক একই ভাবে বিনিয়োগকারীরা তো চাইবে, যাতে তার উৎপাদিত পণ্য ঠিকভাবে বন্দর দিয়ে যেতে পারে বা তার কাঁচামাল যাতে সঠিকভাবে আসতে পারে রাস্তাঘাটে যাতে শান্তি থাকে। যদি মিল কারখানা না চলে সঠিকভাবে তাহলে কি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব? সম্ভব না। সেই জন্য আমাদের সচেতন থাকতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে।
যারা শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায় তাদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। যদি দেশের সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়, স্কুল কলেজ সুন্দরভাবে তৈরি করতে হয়, শিক্ষকদের যদি ট্রেনিং দিতে হয়, ছাত্রছাত্রীদের যদি নতুন করে বই দিতে হয় তাহলে আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে হবে। একইভাবে সতর্ক থাকতে হবে বিভ্রান্তকারীরা যাতে সুযোগ না পায়, কারণ যদি বিভ্রান্ত করার সুযোগ পায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণ। বিভ্রান্তকারীরা নিজেদের মতো করে চলে যাবে। তারা তো জনগণের সাথে থাকবে না। তাই আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আজ বাংলাদেশের মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব নাকি আমরা ঝগড়া ফ্যাসাদে লিপ্ত থাকব? নাকি আমরা বিভ্রান্তকারীদের সাথে থাকব? এ ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপি সরকারের জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, আমরা জনগণের সমর্থনে সরকার গঠন করেছি; জনগণের সমর্থন থাকলেই আমাদের গণমুখী সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। তবে যারা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য জনগণের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করা, দেশের ক্ষতি সাধন। তিনি বলেন, আমাদের কাজ করতে হবে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে।
তিনি সম্প্রতি বন্যায় ক্ষতি প্রসঙ্গে বলেন, এই বন্যায় বহু মানুষের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে। আল্লাহর রহমতে এখানে বাঁশখালীতে ১০০ নতুন বাড়ির চাবি তুলে দিতে পারছি। কিছু দুস্থ মহিলাকে আমরা চাল দিয়ে সহযোগিতা করেছি। আপনাদের নির্বাচিত এই সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এদেশের মানুষের পাশে থাকা, সুখে দুঃখে থাকা, মা-বোনদের পাশে থাকা, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তরুণ সমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এ জন্যই নির্বাচনের সময় আমরা বলেছিলাম, বিএনপি যদি আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের মানুষের ভোটে সরকার গঠনে সক্ষম হয় তাহলে আমরা মূল কয়েকটি কাজে হাত দেব। তার মধ্যে একটি কাজ ছিল এদেশের মায়েদের সহযোগিতার জন্য, এদেশের নারীরা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে সে জন্য আমরা বলেছিলাম ফ্যামিলি কার্ড ঘরে ঘরে পৌঁছাব।
তিনি আরো বলেন, আপনারা দেখেছেন, সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই আমরা সেই ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রজেক্টের কাজে হাত দিয়েছিলাম এবং আল্লাহর রহমতে পাইলট প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এ মাসের ১৬ তারিখ থেকে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের কাজ শুরু করছি। সমগ্র দেশে এ বছর প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের মায়ের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেব। এ উপজেলার মধ্যে ১০-১২ হাজার পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড আগামী অর্থবছরের মধ্যে তুলে দেব এবং আগামী চার বছর ধরে এটি চলবে। আরও অনেক মা-বোনেরা ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আসবেন।
বাঁশখালীর বাহারছড়ায় বিশাল জনসমুদ্রে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা থেকে মাতারবাড়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ প্রমুখ। স্বাগত জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্র সৈকতজুড়ে হাজারো উৎসুক সর্বস্তরের জনগণের ঢল নামে। জনগণ প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে সেøাগান দেন। বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। তিনি একশ’টি গৃহহীন পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন।
প্রধানমন্ত্রী পাহাড়ি দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর পরিবেশ প্রকৃতি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ঝুঁকি মাথায় রেখেই যুগোপযোগী উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাঁশখালী থেকে হেলিকপ্টারে ফটিকছড়ি যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজতের আমির ও দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমেদ্বীন আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে একান্ত বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর মাদরাসা ময়দানে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন তিনি। পরে তিনি হাটহাজারী মাদরাসায় হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরীর কবর জেয়ারত করেন।
এরপর তিনি হাটহাজারী পার্বত্য মডেল হাইস্কুল মাঠে বন্যা দুর্গত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা তুলে দেন। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে চট্টগ্রাম নগরীতে আসেন। রাতে তিনি নগরীর রেডিসন ব্লু অডিটোরিয়ামে চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর বিএনপিসহ ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। এ সাংগঠনিক সভায় সাত শতাধিক নেতা যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে চট্টগ্রাম মহানগরী এবং বাঁশখালী থেকে শুরু করে উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারীতে জনতার ঢল নামে। এসব উপজেলা ছাড়াও পাশর্^বর্তী উপজেলা ও পার্বত্য জেলা থেকে অগণিত মানুষ ছুটে আসেন। প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিস্থলে জনতার ঢল নামে। তাকে একনজর দেখতে সড়কের দুইপাশে অগণিত মানুষ জড়ো হয়। রেডিসন ব্লূকে ঘিরে নগরীর কাজির দেউড়ি স্টেডিয়াম এলাকায় দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। তার সফরকে ঘিরে বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।
আপনার মতামত লিখুন :