বিশ্ব তেলের বাজারে চীনের কৌশলগত আধিপত্য


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : আগস্ট ১৬, ২০২৬, ১১:৩৬ অপরাহ্ণ /
বিশ্ব তেলের বাজারে চীনের কৌশলগত আধিপত্য

জ্বালানি আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা চীনের অর্থনীতির জন্য একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে দেশটি এই সীমাবদ্ধতাকেই সুচতুর কৌশলে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে।

দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকার বিষয়টি একটি বড় অর্থনৈতিক বিস্ময় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, “ইরান যুদ্ধের বড় অর্থনৈতিক বিস্ময় হলো, হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে।” গত ৩০ এপ্রিল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠলেও বাজারে তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে আমদানিকারকদের বড় ধরনের সংকটে পড়তে হয়নি।

এই স্থিতিশীলতার নেপথ্যে প্রধান কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করলেও বেইজিংয়ের সক্রিয় ভূমিকার কারণে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজে হামলার ফলে বিশ্বের মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশ বা ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।

যদিও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ সচল রাখে এবং ধনী দেশগুলো তাদের কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ে, তবে চীন তার দৈনিক আমদানি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে ৫৫ লাখ ব্যারেলে নিয়ে এসে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। নিজস্ব মজুত ব্যবহার, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চীন এই বিশাল ধাক্কা সামলে নিয়েছে।

সংবাদে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো বাজার এভাবে কোনো দেশের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের। চীন এর আগেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজের প্রভাব ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ দেশের ওপর চাপ তৈরি করেছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনের এই বাজার সক্ষমতা অন্য আমদানিকারক দেশগুলোর জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে।

এর ফলে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী জোট ওপেক-এর ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত এই জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ওপেক আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। অতীতে ওপেক সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে রাখলেও এবার চীনের বিশাল মজুত তেলের বাজারকে বড় ধরনের অস্থিরতা থেকে রক্ষা করেছে।

তবে তেলের বাজারে ক্ষমতার এই ভারসাম্য চিরস্থায়ী নাও হতে পারে। ২০৩০ সালের পর নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের অভাবে তেলের ঘাটতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পুনরায় উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রভাব বাড়িয়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে, নিউইয়র্ক টাইমস-এর তথ্যমতে, চীনে তেলের চাহিদা ক্রমশ হ্রাসের পথে।

দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপক প্রসার, বিশাল উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে দেশটি হয়তো তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনবে। এতে বিশ্ববাজারে চীনের বর্তমান প্রভাবও সংকুচিত হয়ে আসতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, চীন মূলত নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থেই তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। যদিও বেইজিংয়ের এই হস্তক্ষেপ অন্যান্য আমদানিকারক রাষ্ট্রগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে কোনো বিশেষ শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা এড়াতে তেলের বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং সার্বিকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের ওপর নির্ভরতা এড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, প্রথমেই তেলের প্রয়োজন কমিয়ে আনা।