

ভাদ্র মাস। গাছে তাল পেকেছে। একটি কাক পাকা তালের ওপর এসে বসতে না বসতেই তালটা পড়ে গেল। তালটা এতই পাকা ছিল যে, কাক এসে না বসলেও পড়ে যেত। তাল পড়ার সঙ্গে কাকটির আসল কোনো কারণ না থাকলেও কাকটিকেই তাল পড়ার কারণ হিসেবে ধরা হলো। এভাবে বাংলা ভাষায় তৈরি হলো ‘কাকতাল’ বা ‘কাকতালীয়’ শব্দ যুগল।
প্রখর জ্যোত্স্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। বাসায় বসা বা গাছের ডালে বসা কাকের মনে হলো, বুঝি ভোর হয়ে গেছে। এখনই ডাকাডাকি করে অন্য কাকদের জাগাতে হবে। খাদ্যের সন্ধানে বেরোতে হবে।
সে ডাকাডাকি শুরু করল, ওড়াউড়ি শুরু করল। এই নিয়ে বাংলা ভাষায় তৈরি হলো ‘কাকজ্যোত্স্না’ শব্দটি। পূর্বজন্মে একজন ঋষি কাকের রূপ ধারণ করে রামচন্দ্রের উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে অমর হয়ে গিয়েছিলেন। সেই কাকের নাম ছিল ‘ভূষণ্ডী’। শব্দ তৈরি হলো ‘কাকভূষণ্ডী’।
ভূষণ্ডী কাকটি বহুকাল বেঁচে ছিল। এ জন্য দীর্ঘজীবী লোককেও ‘কাকভূষণ্ডী’ বলা হয়। কাকের চোখ খুব স্বচ্ছ। এ জন্য নদী বা জলাশয়ের স্বচ্ছ জলকে বলা হয় ‘কাকচক্ষুু জল’। কাকের ঘুম অতিশয় হালকা। এ জন্য বলা হয় ‘কাকঘুম’ বা ‘কাকনিদ্রা’। ঘুমের ভান করাকেও ‘কাকনিদ্রা’ বলা হয়। তীর্থস্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ শ্রাদ্ধ শান্তি বা ব্রাহ্মণ ভোজনাদি করান। শ্রাদ্ধের পিণ্ড ও খাবারের ভুক্তাবশিষ্ট পাওয়ার আশায় কাকেরা প্রতীক্ষা করে থাকে। শব্দ তৈরি হলো ‘তীর্থের কাক’।
কাক নিয়ে শব্দ আর বাগধারার অভাব নেই বাংলা ভাষায়। যেমন ‘বেল পাকিলে কাকের কী?’ ‘ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না।’ ‘কাক কোকিল ভেদ’। এসব শব্দ আর বাগধারার অর্থ আমরা সবাই জানি। কাক পাখিটি কারোরই অপরিচিত নয়। আমাদের নিত্যদিনের জীবনের সঙ্গে এই পাখিটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কাকের আরেক নাম ‘বায়স’। হিন্দুপুরাণ আর বাংলা সাহিত্যের বহু জায়গাজুড়ে আছে পাখিটি। আমরা সাধারণ মানুষ জন্মের পর থেকে পাখিটি দেখে আসছি সর্বত্র। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই যে পাখিটি কর্কশ স্বরে ডাকতে শুরু করত, তার নাম কাক। সকাল আর সন্ধ্যা এই দুটি সময় হচ্ছে পাখিদের বিশেষভাবে ডাকাডাকির সময়। দিনের শুরুতে তারা ডাকে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে ডাকে। বিশেষ কয়েকটি রাতপাখি ছাড়া অন্য পাখিরা রাতে সাধারণত ডাকে না। সকাল-সন্ধ্যা এই দুই সময় কমবেশি সব পাখিই ডাকাডাকি করে। আবার সারা দিনই ডাকে কোনো কোনো পাখি। নির্জন দুপুরে ঘুঘু পাখির ডাকে ঘুম ঘুম ভাব হয় গ্রাম বাংলার মানুষের।
বসন্তকালে কোকিল পাখিগুলো দিনভর তো ডাকেই, রাতেরবেলায়ও ডাকে। কাক খুবই বুদ্ধিমান পাখি। তার পরও কোকিল পাখিটির কাছে সে বোকা বনে যায়। কোকিল নিজে বাসা বাঁধতে জানে না। কাকের বাসায় গিয়ে ডিম পেড়ে আসে। সেই ডিম নিজের মনে করে তা দেয় কাক। নিজের ছানাদের মতো কালো কালো ছানা ফোটায়। একসময় দেখা যায়, নিজের ছানা ভেবে সে কোকিলের ছানা বড় করেছে। কোকিল তার মহাশত্রু। শত্রুর ছানা বড় হয়েছে তার ঘরে। রাগে ক্রোধে প্রতিশোধ নিতে চায় কাক। তখনই ডানা মেলে উড়াল দেয় কোকিল ছানা। কাক আর তার নাগাল পায় না।
কাক দুই রকম। পাতিকাক ও দাঁড়কাক। পাতিকাকের তুলনায় দাঁড়কাক সংখ্যায় কম। এই পাখিটি আকৃতিতে বড়। অতি কর্কশ স্বরে ডাকে। পাতিকাকের মহাশত্রু। সুযোগ পেলেই পাতিকাকের বাসায় গিয়ে তাদের ডিমগুলো ঠুকরে খায়। এমনকি সুযোগমতো পেলে পাতিকাকও ধরে ঠুকরে ঠুকরে খায়। এ জন্য দাঁড়কাক দেখলেই পাতিকাকেরা দলবেঁধে তাড়া করে। রাতের অন্ধকারে গৃহস্থবউ ইলিশ মাছ ভাজছে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে লিকলিকে হাত বাড়িয়ে ইলিশ ভাজা নিয়ে খেয়ে ফেলছে এক পেতনি।
গৃহস্থবউ ব্যাপার বুঝে খুনতি পুড়িয়ে টকটকে লাল করল। তক্কে তক্কে রইল কখন পেতনি ভাজা মাছ নিতে হাত বাড়ায়। সুযোগ এলো। পেতনি হাত বাড়িয়েছে। সেই হাতে পুড়ে টকটকে হওয়া খুনতির ছেঁকা দিয়ে দিল গৃহস্থবউ। শোনা গেল পেতনির আর্তচিৎকার। সকালবেলা দেখা গেল রান্নাঘরের পেছনে একটি দাঁড়কাক মরে পড়ে আছে। এই গল্প গ্রাম বাংলায় খুবই প্রচলিত। পেতনি মরলে দাঁড়কাক হয়।
এত কথা বলার একটাই উদ্দেশ্য—কাক পাখিটি আমাদের জীবনের বহু স্তরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। গ্রামের মানুষ একটা সময় কাকের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়েছে। খাবার ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে কাক। শুকাতে দেওয়া ধান-কাউন নষ্ট করেছে। মুরগির ছানা ধরে নিয়ে গেছে—এ রকম নানা প্রকারের উৎপাত। ফসলের মাঠে কাকের উৎপাত দেখে খড়নাড়া দিয়ে মানুষের মতো তৈরি করে মুখ মাথার জায়গায় মাটির কালো হাঁড়ি বসিয়ে, তাতে সাদা রঙের চোখ এঁকে, পরিত্যক্ত জামাকাপড় পরিয়ে বাঁশের খুটির ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। যা দেখে শস্যদানা খেতে আসা কাকসহ অন্য পাখিরা মানুষ ভেবে ভয় পাবে। শস্যক্ষেতে নামবে না। এই জিনিসের নাম দেওয়া হয়েছে ‘কাকতাড়ুয়া’। এখানেও প্রধান চরিত্রে কাক। তার মানে, হাজার বছরের বাঙালি জীবনযাত্রার সঙ্গে কাক পাখিটি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।
শহরে বাস করা মানুষদেরও একটা সময় ঘুম ভাঙত কাকের ডাকে। ঘুম ভেঙেই দেখা যেত চারদিকে ওড়াউড়ি করছে কাক। খাবারের আশায় বাড়ির আনাচে কানাচে হানা দিচ্ছে। ময়লার ভাগাড়ে বা ডাস্টবিনে ঝাঁক বেঁধে নেমেছে। মরা ইঁদুর ঠোঁটে করে উড়াল দিচ্ছে। অর্থাৎ পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করছে। নিজের খাবারের ব্যবস্থা যেমন করছে, পরিবেশও তেমনিভাবে পরিচ্ছন্ন রাখছে। দেয়ালের কার্নিশে বসে ডাকছে কাক, ইলেকট্রিকের তারে বসে ডাকছে। একটা কাক মারা পড়লে শত শত কাক এসে চিৎকার আর ওড়াউড়ি করছে। শহরে কাকগুলো সাধারণত মারা যেত ট্রান্সমিটার ব্লাস্ট হয়ে। কাকের কারণেই দুর্ঘটনাটা ঘটত। তারপরই চারদিক থেকে উড়ে আসত শত শত কাক। এই পাখিটি জীবনে একবারই বাসা বাঁধে, একবারই ডিম পাড়ে। তারপরও কাকের কোনো অভাব এ দেশে কখনোই ছিল না। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন দুর্ভিক্ষের অবিস্মরণীয় ছবি এঁকেছিলেন। একটি ছবিজুড়ে আছে কয়েকটি কাক। কাক সেই ছবিতে হয়ে আছে দুর্ভিক্ষের প্রতীক।
কাক নিয়ে মানুষের কিছু ভুল ধারণা আছে। একটা কাক মারা গেলে শত শত কাক এসে তার চারপাশে ডাকাডাকি শুরু করলে মানুষ ভাবে কাকগুলো দুঃখ করছে বা কান্নাকাটি করছে। আসলে তা না। ওরা ডাকাডাকি করে নিজেদের সতর্ক করার জন্য। যেন যে কারণে একটি কাক মারা গেছে, সেই কারণে অন্য কোনো কাকের মৃত্যু না হয়। কোথাও বিপদ দেখলে কাক আগেই তা টের পায়। সাবধান হয়। কাক মানুষের চেহারা মনে রাখে। তাকে কেউ অপমান করলে মনে রাখে। কাক এক অর্থে পরিবেশের ঝাড়ুদার। নোংরা আবর্জনার মেথর। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার এই পাখিটির ভূমিকা অতুলনীয়। বনের মেথর যেমন হায়েনা, তেমনি দুটি পাখি গ্রাম ও শহুরে জীবনের মেথর হিসেবে কাজ করে। তারা হলো শকুন আর কাক।
কয়েক বছর আগে এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শকুন আছে ২২৬টি। অথচ একসময় গ্রামের ‘মড়কখোলা’য় মরা গরু ছাগল ভেড়া ফেলে এলে আকাশ কালো করে শকুনের দল এসে নামত। কয়েক মিনিটের মধ্যে মরা প্রাণীটির কঙ্কাল ছাড়া আর কিছুই থাকত না। শকুনের সঙ্গে কাকেরাও ভাগ বসাত। প্রাণীগুলোর হাড়গোড় খেয়ে সাফ করত শেয়াল কুকুরে। এখন কোথায় সেই শকুনের দল?
কাকের অবস্থাও কী শকুনের মতোই? আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী এই পাখিটিও কি বিলুপ্তির পথে? এখন কি ঢাকা শহরে কাকের ডাকে কারো ঘুম ভাঙে? ‘কাকভোর’ কথাটা কী এখন আর কারো মনে পড়ে? শহরের ডাস্টবিনগুলোতে কিংবা ইলেকট্রিকের তারে কিংবা গাছের ডালে, দেয়ালের কার্নিশে কাক পাখিটি এখন কি আর বসে থাকতে দেখা যায়? শহরের গাছপালাগুলোতে একটা বিশেষ সময় কত কত কাকের বাসা চোখে পড়ত। এখন কি আর তা দেখা যায়? বাসা থেকে একটা কাকের ছানা পড়ে গেছে, কালো লম্বা ঠোঁটের ভেতরটা টকটকে লাল। ছানাটি আর্তনাদ করছে আর তার চারপাশে ভিড় করে ডাকাডাকি করছে বিশ-পঞ্চাশটি কাক। কোথাও কী দেখা যায় এই দৃশ্য? শহরে কেন, গ্রামেও এখন আর কাক নেই। হাটবাজার আর জনবহুল জায়গাগুলোতে কাক নেই। কাকের ডাক শোনা যায় না। কাকের ওড়াউড়ি দেখা যায় না। কাক পাখিটি যেন নিঃশব্দে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।
আমাদের দেশে এখন পাখিপ্রেমী মানুষ অনেক। হাওর বা বিল অঞ্চলের কোনো কোনো বাড়ির গাছে দেখা যায় শত শত বক আশ্রয় নিয়েছে। বাড়ির মানুষ মোটেই তাদের বিরক্ত করছে না। পাখিরা নিরাপদে থাকছে। পরিযায়ী পাখি এখন আর কেউ শিকার করে না। শীতকালে হাওর বিল আর অন্য জলাশয়গুলো হয়ে ওঠে পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ বিচরণভূমি। বহু পরিবেশবাদী সংগঠন গাছে গাছে পাখির নিরাপদ বসবাসের জন্য হাঁড়ি বেঁধে দিচ্ছে। আহত পাখির সেবা করছে বহু মানুষ। অর্থাৎ পাখিপ্রেমী মানুষের এখন আর অভাব নেই। কাকগুলো যে নিঃশব্দে বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হতে বসেছে, এদিকটায় কি কারো নজর পড়েনি? এ নিয়ে তো কোথাও কোনো উচ্চবাচ্য দেখি না! কাউকে তো এ নিয়ে কথা বলতে দেখি না! কাক নিয়ে কবে আমরা সচেতন হব বা কথা বলতে শুরু করব? কাকও যখন শকুনের মতো সারা দেশে দুই-তিন শতে এসে দাঁড়াবে তখন কি আমাদের চোখ খুলবে?
অনেকে ভাবতে পারেন, কাকের মতো অতিতুচ্ছ ও কর্কশ একটি পাখি নিয়ে এত ভাববার বা কথা বলার কী আছে? আছে এই কারণে, পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য। কাক পাখিটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য কতটা প্রয়োজনীয় তা একবার ভাবা উচিত। সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়ার আগেই এই পাখিটির যত্ন নিতে হবে। নয়তো একদিন আমরা দেখব কাক পাখিটি বাস্তবে নেই, আছে পাখি বিষয়ক বইগুলোর পাতায় আর বিলুপ্ত পাখির তালিকায়। আছে গল্পগাথা আর সাহিত্যে, আছে মহান শিল্পীদের অবিস্মরণীয় শিল্পকর্মে।
আপনার মতামত লিখুন :