আইন সংবিধান অনুযায়ী যা করা দরকার পুলিশ সেটাই করবে, অনুমতি পেলেই ‘ক্রসফায়ার’ : আইজিপি


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ / ০
আইন সংবিধান অনুযায়ী যা করা দরকার পুলিশ সেটাই করবে, অনুমতি পেলেই ‘ক্রসফায়ার’ : আইজিপি

ডা. তাসনিম জারা জেন-জি পরিচিত মুখ। এনসিপি’র এই নেত্রী বলেছেন, ‘জামায়াত বিরোধী দলে থাকতেই মৃত্যু ব্যাক্তির নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?’ বিরোধী দলের এই অবস্থা হলে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থা আরো ভয়াবহ। সরকারি দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলের মহোৎসব চলছে। আইন শৃংখলা পরিস্থিতির এতোই অবণতি যে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে ভয় পাচ্ছেন। পুলিশের হিসেব মতে গত ৯ মাসে দেশে ২৯১১টি হত্যামামলা দায়ের হয়েছে। যা প্রতিদিন গড়ে ১১টি। এর মধ্যে পরিস্থিতির এতোই অবণতি যে খুলনা এলাকায় রাতে পুলিশকে একাই চলাফেরা না করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

গত ২৫ অক্টোবর পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, ‘পুলিশ বাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে; মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে’। এ বক্তব্য দেয়ার ২৪ ঘন্টা পর গতকাল আইজিপি বলেছেন, ‘কে আসবে, কবে আসবে, কী হবে, ওইটা আমাদের আইনশৃংখলা বাহিনীর দেখার বিষয় না। আমাদের দায়িত্ব আইন সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটাই করব। যেখানে ক্রসফায়ারের যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ (অনুমতি) করে আমরা (পুলিশ) সেটাই করব।’

দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি যে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে তা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যাক্তিরা স্বীকার করছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেস্টাদের বক্তব্য তা উঠে আসছে। খাদের কিনারে পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে গতিশীল করা সম্ভব হচ্ছে না কার্যত আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবণতির কারণে। গ্যাস-বিদ্যুতের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা বারবার আইন শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একের পর এক দেশ সফর করছেন; বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রতি তাঁর বার্তাই হচ্ছে বাংলাদেশে বেশি বেশি বিনিয়োগ করুন। বাংলাদেশের বিনিয়োগের সব ধরণের সহায়তা দেয়া হবে এমন প্রতিশ্রুতি তিনি দিচ্ছেন। জাপান সফরেও তিনি একই বার্তা দিয়েছেন সে দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলেও আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর মধ্যে যোগ হয়েছে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ‘নাটক’। মোদীর সহায়তায় হাসিনা দেশে ফেরবেন এমন স্বপ্ন থেকে আওয়ামী লীগের কিছু ডেভিল ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে অরাজকতা সৃষ্টির পায়তারা করছে। মাঝেমাঝেই ওই ডেভিলরা মিছিল, যানবাহনে অগ্নি সংযোগ করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

অন্যদিকে ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অপরাধীরীদের তান্ডবে আইনশৃংখলার ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এমন প্রেক্ষাপটে গত সেপ্টেম্বর মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজনে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী নামানো হতে পারে’। তবে কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের উদ্বোধনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ‘বর্তমান সরকারের অপারেশন ক্লিন হার্ট-এর মতো কোনো বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেই। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বর্তমানে কোনো চ্যালেঞ্জ অনুভব করছে না। তবে অপরাধী গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশ মাঝেমধ্যে হামলার শিকার হচ্ছে। এরপরও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ সরকারিআদেশ দেখুন

এদিকে গতকাল মুন্সীগঞ্জে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সালাহউদ্দিন আহমদের পদত্যাগের দাবিতে শাহবাগে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। নাহিদ ইসলাম দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘দেশের কোথাও মানুষের নিরাপত্তা নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যার দায়িত্ব দেশের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। তা বাদ দিয়ে- তিনি এখন সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে ব্যস্ত আছেন। কাজেই আমরা মনে করি তিনি আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকতে পারেন না। তাকে পদত্যাগ করতেই হবে’।

গতকাল পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিকের’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ফ্যাসিস্ট বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে। আইনশৃংখলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে এবং দায়িত্ব পালনে সক্ষম করতে হবে। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করব।’

আইজিপি বলেন, ‘সমাজে শান্তি ও শৃংখলা বজায় রাখতে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী চলতে হবে। পুলিশ সদস্যদের অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।, আইনশৃংখলা রক্ষায় পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে। গুজব ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা জরুরি। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন’। তিনি আরো বলেন, ‘কে আসবে, আপা কবে আসবে ওইটা আমাদের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখার বিষয় না। আমাদের দায়িত্ব, আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেইটাই আমরা করব। পুলিশকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা কইরেন না, নিজেরাও ব্ল্যাকমেল হইয়েন না। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন, এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন। আমরা (পুলিশ) কোনো মানবাধিকার লংঘন করি নাই। কোনো আনওয়ান্টেড ফোর্স অ্যাপ্লাই করি নাই দাবি করে আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে পুলিশের যে অবস্থা ছিল, পুলিশ রাস্তায় ডিউটি করতে ভয় পেত, কোথাও যেতে সাহস পেত না। সেই অবস্থা থেকে উন্নয়নের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি।’

পুলিশের আইজিপির ‘অনুমতি পেলেই ক্রসফায়ার’ এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, আইজিপির এই বক্তব্য আইনশৃংখলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়। এটা সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞা।