

ফাইল ছবি
পঞ্চম বছরে পদার্পণ করা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকে বসার আহ্বান জানিয়ে একটি বিস্তারিত খোলা চিঠি লিখেছেন। অন্যদিকে, রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে পুতিন যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়ার অগ্রগতির দাবি করার পাশাপাশি শান্তি আলোচনার জন্য নিজস্ব শর্তাবলি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তার চিঠিতে পুতিনের দীর্ঘ ২৬ বছরের শাসনকাল এবং যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই যুদ্ধ কোনো ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি পুতিনের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল। জেলেনস্কি চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, রাশিয়ার সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ী সমাজ যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার আশঙ্কায় রুশ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তিনি আরও জানান, গত মে মাসেই ইউক্রেন ফ্রন্টে রাশিয়ার ৩০ হাজারের বেশি সেনা হতাহত হয়েছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনো আধুনিক সেনাবাহিনীর পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
শান্তি প্রস্তাবের অংশ হিসেবে জেলেনস্কি সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক বা আরব বিশ্বের কোনো নিরপেক্ষ দেশে সরাসরি মুখোমুখি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি এই প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত করার কথা বলেন। আলোচনার সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকরের প্রস্তাব দিয়ে তিনি জানান, এটি মার্কিন উপগ্রহ প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। এছাড়া ‘অল-ফর-অল’ ভিত্তিতে সকল যুদ্ধবন্দি বিনিময় এবং বাস্তুচ্যুত নারী ও শিশুদের দ্রুত ফেরত দেওয়ার শর্তও তিনি চিঠিতে জুড়ে দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাশিয়া যদি নিজ থেকে যুদ্ধ বন্ধ না করে, তবে ইউক্রেন সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার কঠোর অবস্থানে অনড় থেকে দাবি করেছেন যে, রুশ বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নতুন এলাকা দখল করছে। তিনি জানান, বর্তমানে লুহানস্কের সম্পূর্ণ এবং দোনেৎস্কের ৮৫ শতাংশের বেশি এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কিয়েভ যদি আপস করতে প্রস্তুত থাকে, তবেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা কার্যকর হতে পারে। তিনি গত বছর ট্রাম্পের সঙ্গে ‘অ্যাঙ্কোরেজ’ বৈঠকে হওয়া সমঝোতার ভিত্তিতে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনার কথা বলেন, যেখানে ইউক্রেনকে তার পূর্বদিকের দনবাস অঞ্চলের দাবি ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
পুতিন আরও বলেন, ইউক্রেনীয় পক্ষ চাইবে রাশিয়া যেন অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়, কিন্তু সমঝোতার শর্তে একমত হওয়া ছাড়া এটি সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান সংকট নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত ইউক্রেনকে সমঝোতায় রাজি করাতে ভূমিকা রাখা। ক্রেমলিন সূত্রে জানানো হয়েছে যে, পুতিন জেলেনস্কির খোলা চিঠির বিষয়ে অবগত থাকলেও এর বিষয়বস্তু এখনও বিস্তারিত পর্যালোচনা করেননি। বিশ্বনেতারা এখন তাকিয়ে আছেন দুই দেশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যেখানে জেলেনস্কি তার চিঠির সমাপ্তি টেনেছেন ‘গ্লোরি টু ইউক্রেন’ স্লোগান এবং যুদ্ধের সকল নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। দ্য গার্ডিয়ান সূত্রে এই বিস্তারিত খবরটি জানা গেছে।
আপনার মতামত লিখুন :