চৌগাছার শিশুস্বর্গের শিক্ষাগুরু চিত্রশিল্পী আসাদুজ্জামান আর নেই! শত শত শিক্ষার্থীকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ৭:০৩ পূর্বাহ্ণ /
চৌগাছার শিশুস্বর্গের শিক্ষাগুরু চিত্রশিল্পী আসাদুজ্জামান আর নেই! শত শত শিক্ষার্থীকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি:
চৌগাছার চারুকলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ, শিশুদের প্রিয় শিক্ষাগুরু, চিত্রশিল্পী ও শিল্পী-সংস্কৃতিসেবী আসাদুজ্জামান আর নেই। গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে চৌগাছা পৌরসভার নিজ বাড়িতে অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

মরহুম আসাদুজ্জামান ছিলেন মাওলানা জয়নাল আবেদীনের সন্তান। তাঁর গ্রামের বাড়ি চৌগাছা উপজেলার মাঠচাকলা গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চৌগাছা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাস করছিলেন।

চৌগাছার আর্ট ও সাইনবোর্ড লেখার জগতে তাঁর ছিল দীর্ঘদিনের বিচরণ। তাঁর হাত ধরে শিল্পচর্চায় যুক্ত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন শিশুদের আপনজন ও চারুকলার নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক।

শিশুদের ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং তাদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে তিনি ‘আটঘর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় চৌগাছা বৈশাখী মঞ্চের হলরুমে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শিশুস্বর্গ’। সেখানে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ছবি আঁকা, হাতের লেখা, আবৃত্তি ও সংগীতসহ বিভিন্ন সৃজনশীল বিষয়ে শিক্ষা দিতেন তিনি।

শিশুস্বর্গ আজ শূন্যঃ আসাদুজ্জামানের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছে তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিশুস্বর্গের শিক্ষার্থীরা। যাঁর কাছে ছবি আঁকার পাশাপাশি শিখেছে সৃজনশীলতার আনন্দ, সেই প্রিয় শিক্ষক আর নেই—এ কথা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না কোমলমতি শিশুরা। অনেক শিক্ষার্থীর চোখে এখন অশ্রু, মুখে প্রিয় শিক্ষকের স্মৃতি।

শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন একজন অভিভাবক, বন্ধু ও অনুপ্রেরণার মানুষ। তাঁর স্নেহ, উৎসাহ ও হাতে ধরে ছবি আঁকা শেখানোর স্মৃতি দীর্ঘদিন তাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

তাঁর মৃত্যুতে চৌগাছার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী এবং তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শত শত শিক্ষার্থী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। চৌগাছার সর্বস্তরের মানুষ তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর মৃত্যুতে শোক ও স্মৃতিচারণে ভরে উঠেছে বিভিন্ন পোস্ট।

ছিলেন এস এম সুলতানের প্রিয় শিষ্যঃ
আসাদুজ্জামান শুধু চৌগাছারই নন, তিনি ছিলেন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের প্রিয় শিষ্য এবং তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম অনুসারী। যশোর অঞ্চলে এস এম সুলতানের সঙ্গে তাঁর শিল্পসম্পর্ক ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চিত্রকলার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ও দক্ষতা তাঁকে চৌগাছার শিল্পাঙ্গনে স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দেয়।

তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সদস্য ছিলেন। শিল্প ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘গুণীজন সম্মাননা স্মারক’ লাভ করেন। উদীয়মান সংগঠন ‘আমরাই আগামী চৌগাছা’ তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেয়।

চৌগাছার সবুজ কুঁড়ি প্রি-ক্যাডেট স্কুল, বেলা প্রি-ক্যাডেট, উপজেলা লাইসিয়াম স্কুল, চৌগাছা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কবি আহমদ আলী সাহিত্যরত্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি চারুকলা শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিল্পী আসাদুজ্জামানের চলে যাওয়ায় চৌগাছা হারাল চারুকলার এক নিবেদিতপ্রাণ মানুষকে। হারাল একজন শিশুবান্ধব শিক্ষক, যিনি নিজের শিল্পীসত্তাকে শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং শত শত শিশুর হাতে তুলে দিয়েছেন রং-তুলি, জাগিয়ে তুলেছেন সৃজনশীলতার স্বপ্ন।

আজ তাঁর ‘শিশুস্বর্গ’-এর দরজা হয়তো আগের মতোই আছে, কিন্তু নেই সেই প্রাণপ্রিয় শিক্ষাগুরু। তাঁর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। চৌগাছার শিল্প, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অবদান এবং অসংখ্য শিশুর হৃদয়ে রেখে যাওয়া স্মৃতি তাঁকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।