তিস্তা-সুরমাসহ সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জুলাই ২১, ২০২৬, ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ /
তিস্তা-সুরমাসহ সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি

টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ওই এলাকার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এবার দেশের উত্তর ও উত্তর-পূবাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। সেই সাথে দেশের মধ্যাঞ্চলেও বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ নদীর পানি বাড়ছে। ইতোমধ্যে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে ভারতের উজানে ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্য বেড়েছে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সর্বশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, আগামী দু’দিনে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আরো বেড়ে কোথাও কোথাও বিপদসীমা ছাড়াতে পারে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। আবার ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি বাড়লেও এখনও বিপদসীমার নিচে রয়েছে। আগামী পাঁচ দিনে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদ-নদীর পানিও বাড়তে পারে। তবে সেগুলো বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা কম।

চলতি মাসের শুরুতে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চলে বন্যা হয়েছিল। এবারও উজানে বৃষ্টির কারণে একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা। ভারতের উজানে বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি রংপুর ও কুড়িগ্রামে আরো বাড়বে। ইতোমধ্যে জেলার নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তবে এখনও নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় কুশিয়ারা নদী সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদী ছাতক এবং কুশিয়ারা নদী মৌলভীবাজারের শেরপুর পয়েন্টে সতর্কসীমার কাছাকাছি রয়েছে। আগামী তিন দিনে এসব নদীর পানি আরো বাড়তে পারে। এছাড়া নেত্রকোনার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। আত্রাই, করতোয়া, ছোট যমুনা ও যমুনেশ্বরী নদীর পানি কিছুটা কমেছে। তবে নওগাঁর কয়েকটি পয়েন্টে আত্রাই ও ছোট যমুনা এখনও সতর্কসীমায় রয়েছে। জামালপুর ও বগুড়ার কিছু এলাকায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। ঢাকা ও আশপাশের নদীগুলোর মধ্যে ধলেশ্বরীর পানি কিছুটা বেড়েছে। তবে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও টঙ্গী খালের পানি স্থিতিশীল রয়েছে।

এদিকে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা চার দিন ধরে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অস্বাভাবিক জোয়ারে উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে বিভিন্ন লঞ্চ ও ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে ও পন্টুন। এতে যাত্রীদের ঝুঁঁকি নিয়ে নৌযানে ওঠানামা করতে হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কীর্তনখোলা, তেঁতুলিয়া, মেঘনা, বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রা নদীর একাধিক পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে। এবারই প্রথম একসঙ্গে এতগুলো নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়ায় কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ে গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানায়, গেট দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে ছাড়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট দিয়ে আরো ৩২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এদিকে উত্তরাঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নদীতীরবর্তী এলাকার উঁচু সড়কগুলো চরম ঝুঁঁকির মধ্যে পড়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এসব বাঁধ চলতি বন্যায় বড় ঝুঁঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুকনো মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব বাঁধ সংস্কার না করে ফেলে রাখে। বর্ষা এলে জরুরি মেরামতের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। অথচ শুকনো মৌসুমেই বাঁধ সংস্কার করা হলে কাজ যেমন টেকসই হতো, তেমনি নদীভাঙন ও বন্যার ক্ষয়ক্ষতিও অনেকাংশে কমানো যেত।

টানা বৃষ্টি ও ভারতের ঢলে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যে বন্যা হয়েছে তাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে অর্ধশতাধিক প্রাণহানির পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী কমপক্ষে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। গত সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে ছিল। গত দুই দিনে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে আসায় পানি নামতে শুরু করেছে। তবে এখনো প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বন্যার পানিতে মাছের খামার ও পুকুর ভেসে যাওয়ায় এ খাতে ৪০৭ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৮১ কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা। তবে ক্ষয়ক্ষতির এ হিসাব প্রাথমিক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত হবে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর বন্যায় গড়ে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ১১,৮০০ কোটি টাকা) সমমূল্যের আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে। এছাড়া সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যায় বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কোটি ডলার, যা দেশের জিডিপির প্রায় ১.৩২ শতাংশ। তাই শুধু ত্রাণ সহায়তা নয় বন্যা মোকাবেলায় স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করছেন। বন্যার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচকাজে ব্যবহার এবং নদী ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানের জন্য এই প্রকল্প দুটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে তারা মনে করেন ।

বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত ইনকিলাবকে বলেন, বন্যা বাংলাদেশের জন্য একটি নিয়মিত বিষয়। এটিকে প্রকৃতিক দুর্যোগ বলা ঠিক নয়। বন্যা আমাদের দেশের জন্য আর্শিবাদ। তবে আমাদের দেশের নদ-নদীর নাব্যতা সঙ্কটের কারণে বন্য এখন আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ জন্য প্রতিবছর বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে যার সঠিক হিসাব সম্ভব নয় এবং সেটা পূরণ করাও যায় না। তাই বন্যার ক্ষতি থেকে দেশকে রক্ষার জন্য স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প দুটি জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা দরকার। তিস্তা মহাপরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের তিস্তা অববাহিকার পাঁচটি জেলা যেমন, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা এবং লালমনিরহাটে বন্যা ও নদী ভাঙন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বর্ষাকালে উজানের ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভাঙন ঠেকানো এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য পানি ধরে রাখা বা রিজার্ভার হিসাবে কাজ করবে। পদ্মা ব্যারেজ বর্ষাকালে পদ্মা ও এর শাখা নদীতে অতিরিক্ত যে পানি প্রবাহিত হয়, তা ব্যারেজের মাধ্যমে ধরে রাখা যাবে। সংরক্ষিত এই পানি শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি জমিতে সেচ ও পানির সংকট মেটাবে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে যে পানি সংকট তৈরি হয়, তা নিরসন করে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যাবে। এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।Geographic Reference

এদিকে নীলফামারী জেলা সংবাদদাতা, উজানের ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টির প্রভাবে আবারও বাড়তে শুরু করেছে তিস্তা নদীর পানি। এর ফলে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের সবকটি ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।

গতকাল সোমবার সকাল ১২টায় নীলফামারীর ডিমলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ৮ মিটার। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। অর্থাৎ নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে, সকাল ৯টায় এ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিসা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল এবং জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।