

কিছু ব্যাংকমালিকের বিলাসী জীবনযাত্রা নিয়ে অর্থমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
রাজধানীর একটি হোটেলে শুক্রবার সন্ধ্যায় ‘পোস্ট-আপ্রাইজিং ইকোনমি অ্যান্ড জিওপলিটিকস অব বাজেট, রেমিনিসিং দ্য লেগাসি অব এম সাইফুর রহমান’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপ হয়। এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ব্যাংকারেরা অংশ নেনছবি – আয়োজকদের সৌজন্যে
বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘বেসরকারি খাতেরও কথা বলা দরকার। তাদের দায়িত্ব আছে। বেসরকারি খাত নিরাপদ দূরত্বে বসে থাকতে পারে না। কোন কোন জায়গায় সমস্যা হয়েছিল, কেন হয়েছিল, সেগুলো আপনাদের বলতে হবে।’
শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে ‘পোস্ট-আপ্রাইজিং ইকোনমি অ্যান্ড জিওপলিটিকস অব বাজেট, রেমিনিসিং দি লেগাসি অব এম সাইফুর রহমান’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে খেলাপি ঋণে জর্জরিত একটি ব্যাংকের মালিকপক্ষের উদাহরণ টেনে অর্থমন্ত্রী ব্যাংকমালিকদের বিলাসী জীবনযাত্রা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার কাছে ব্যাংকমালিকদের একটা দল এসেছিল। ২ হাজার কোটি টাকা না হলে ওনাদের ব্যাংক চলবে না। ওনাদের নাকি ৯৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ (এনপিএল) হয়ে গিয়েছিল। এখন উনি (একজন ব্যাংকমালিক) আমাকে বলছেন, স্যার, আমরা কিন্তু খেলাপি ৯৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫৬ শতাংশে নিয়ে আসছি। একবার ভাবুন, কেমন মানসিকতা তাদের।’
এ সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাংকের মালিকদের জীবনযাপন কেমন, তা আমরা সব জানি।’
ব্যাংক খাতের টাকা লুটপাটের পেছনে দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষার বড় দায় আছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে আর্থিক প্রতিবেদনের মান খুব খারাপ জায়গায় আছে। আর্থিক প্রতিবেদন যথাযথ না হলে পুরো হিসাবের আসল চিত্র ঠিকমতো প্রকাশ পায় না। ব্যাংকগুলো থেকে অর্থায়নের টাকাপয়সা যে লুটপাট হয়েছে, এর জন্য কোনো না কোনোভাবে এই দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদনই দায়ী।
অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারের বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে পুঁজিবাজারের গঠনে বড় পরিবর্তন দেখা যাবে। সেখানে কোনো রাজনৈতিক লোক নিয়োগ দেওয়া হবে না, বরং পেশাদার ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন–সংকট মেটাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা (আইএফসি) এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোকে যুক্ত করে ব্যাংকিং খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বিগত দিনগুলোতে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য বিশাল কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তার লক্ষ্যে ‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ’ স্লোগানকে সামনে রেখে আগামী বাজেটে এর বিশেষ প্রতিফলন থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো গোষ্ঠীকে বাইরে রেখে অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগানো যাবে না।’
‘দাম বৃদ্ধি ঠেকাতে কৌশলগত মজুত’
নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশ কিছু পণ্যের ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’ বা কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা হবে বলে অনুষ্ঠানে জানান বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, হঠাৎ কোনো কারণে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত (সাপ্লাই শক) হলে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে তার সরাসরি ধাক্কা বা অভিঘাত যেন দেশের ভোক্তাশ্রেণির ওপর না পড়ে সেটি নিশ্চিত করা।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে কোনো স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ নেই। এটি সম্ভবত পৃথিবীর বুকে একটি বিরল ঘটনা। এর ফলে দেশের বাজারব্যবস্থার ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। মাত্র ১৫-২০ দিনের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেই দেশের বাজার তা সহ্য করতে পারে না।
নিত্যপণ্যের দাম কমবে কি না, অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে এ প্রশ্ন করেন উপস্থিত একজন। জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যেসব জিনিসে আমাদের আমদানিনির্ভরতা আছে, যেসব ব্যবসায় খুব সহজে সবার পক্ষে ঢোকা সম্ভব না। কারণ, এক জাহাজ ডাল, এক জাহাজ সয়াবিন বা তেল আনতে কয়েক শ কোটি টাকা লাগে।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে প্রতিটি জরুরি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানি পণ্যের জন্য মজুত ব্যবস্থা তৈরি করতে যাচ্ছেন। সরকারের হাতে যেন পর্যাপ্ত মজুত থাকে এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ করার সক্ষমতা তৈরি হয়। এর ফলে আর কোনো কৃত্রিম সংকটের শিকার হতে হবে না।
অতীতে পর্যাপ্ত মজুত না থাকার খেসারত দিতে হয়েছে উল্লেখ করে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক জটিলতার কারণে আমাদের অনেক বাড়তি দামে এলএনজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস), ডিজেল ও সার কিনতে হয়েছে। এই প্রতিটি জিনিসের যদি আমাদের পর্যাপ্ত মজুত সক্ষমতা থাকত, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কাছে এভাবে আমাদের নতি স্বীকার করতে হতো না।’
সরবরাহ চেইনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
এ ছাড়া দেশে জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়ার পেছনে উচ্চ পরিবহন ও আনুষঙ্গিক (লজিস্টিক) খরচকে একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে লজিস্টিক খরচ জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক মানদণ্ড হচ্ছে ১০ শতাংশ। এই খরচ কমিয়ে আনার জন্য বেশ কিছু খাত চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানে বড় ধরনের সংস্কার করা হবে।
কৃষি পণ্যের হাতবদল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে দামের অস্বাভাবিক তারতম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যশোরে যে কৃষক সবজি উৎপাদন করছেন, তিনি হয়তো দাম পাচ্ছেন ১০ বা ১২ টাকা। কিন্তু সেই পণ্যই যখন ঢাকার কারওয়ান বাজারে এসে পৌঁছায়, তখন তার দাম হয়ে যাচ্ছে ৫২ থেকে ৬৪ টাকা। মাঝখানের এই যে অস্বাভাবিক দামের তারতম্য এবং যেসব হাতবদলের কারণে এটি ঘটছে, সেই জায়গাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই ব্যবধান কমিয়ে এনে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় সরকার দ্রুত কয়েকটি অনুসন্ধানী মিশন (ফাইন্ডিং মিশন) পরিচালনা করবে বলে জানান তিনি।
‘সমুদ্র জয়ের পরেও সেখান থেকে সম্পদ আহরণ করতে না পারা দুর্ভাগ্যজনক। আগামী সপ্তাহের সোমবার আমরা অফশোর ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডার (আন্তর্জাতিক দরপত্র) আহ্বান করতে যাচ্ছি। আশা করি, অতি দ্রুত আমরা গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে যেতে পারব।’ এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে, রিগ (খননযন্ত্র) কেনা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বাপেক্সের যেহেতু গভীর সমুদ্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই, তাই আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তাদের কাজ করতে বলা হয়েছে, যাতে দেশের একটা অংশীদারত্ব বা স্টেক থাকে।
বাড়ি বাড়ি গ্যাস দেওয়া ছিল ঐতিহাসিক ভুল
বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়াকে আত্মঘাতী উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার আমলে বিশ্বব্যাংকের চাপের মুখেও আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ৬৫ শতাংশ সরকারের হাতে থাকবে। কারণ, জেনারেশন এমন একটি জায়গা, যা বেসরকারি খাতের হাতে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিলে তারা যেকোনো সময় সরকারকে ব্ল্যাকমেল করতে পারে। কিন্তু গত ১৭ বছরে ঠিক তার উল্টোটা করা হয়েছে।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘এখন কুইক রেন্টাল ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর হাতে চাবিকাঠি। আমার পাওয়ার স্টেশন চলে না, অথচ চুক্তি অনুযায়ী তাদের বসিয়ে বসিয়ে টাকা (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হচ্ছে। কী এক জটলা তৈরি করে দিয়ে গেছে! প্রতিদিন সকালে উঠেই বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো টাকা চায়, টাকা না দিলে বিদ্যুৎ বন্ধের হুমকি দেয়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিদিন আমাকে অর্থমন্ত্রীর কাছে টাকার জন্য দৌড়াতে হয়।’
তিনি জানান, শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া চালাতেই প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুতে নতুন নীতিমালা জুনের মধ্যে
অনুষ্ঠানে দুটি পৃথক অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ফওজুল কবির খান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান, এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান শরীফ জহির, এনআরবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ, বারভিডা সভাপতি আবদুল হক, সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিমা ফেরদৌস প্রমুখ। অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
প্রথম অধিবেশন সঞ্চালনা করেন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের হেড অব নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স জহিরুল আলম। দ্বিতীয় অধিবেশন সঞ্চালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো এবং গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী।
আপনার মতামত লিখুন :