প্রধানমন্ত্রীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সফর আজ


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৫, ২০২৬, ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ / ০ Views
প্রধানমন্ত্রীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সফর আজ
  • উদ্বোধন করবেন দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণকাজ ও নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমুদ্র বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের প্রত্যাশায় আজ বৃহস্পতিবার মোংলা বন্দর সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি মোংলায় তাঁর দ্বিতীয় সফর। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘন ঘন সফর এবং মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। দিনব্যাপী এ সফরে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন তিনি।

সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে মোংলা বন্দরে চার হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়বে, পণ্য ওঠানামার গতি বৃদ্ধি পাবে এবং আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার হবে। পাশাপাশি বন্দরের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ার মধ্য দিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

মোংলা বন্দর শুধু বাগেরহাটের নয়, বরং খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইলসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা বন্দরের আধুনিকায়ন, নাব্যতা রক্ষা, পণ্য পরিবহনে গতিশীলতা এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষ করে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পকারখানা, আমদানি-রফানিমুখী ব্যবসা, কৃষিপণ্য ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে প্রকল্পগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং বন্দরের সঙ্গে সড়ক, রেল ও নৌযোগাযোগের সমন্বিত উন্নয়ন জরুরি।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহম্মেদ মোস্তফা জানিয়েছেন, এই মেগা উদ্যোগের অংশ হিসেবে ৩৬৮ মিটার দীর্ঘ একটি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল ও সুবিশাল ইয়ার্ড নির্মিত হবে। কন্টেইনার ব্যবস্থাপনার গতি বাড়াতে নতুন ইয়ার্ডে যুক্ত করা হবে ৪৯টি আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি, যার ফলে প্রতি ঘণ্টায় ৩০টির বেশি কনটেইনার খালাস করা সম্ভব হবে। এছাড়া ঝুঁঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পণ্য নিরাপদে পরিবহনের জন্য সেখানে পৃথক ‘ডেঞ্জারাস কার্গো হ্যান্ডলিং’ ব্যবস্থার সুবিধা রাখা হচ্ছে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর দ্রুততম সময়ে নির্মাণকাজ শুরু করে প্রকল্প শেষে বন্দরের সার্বিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বছরে চার লাখ টিইইউতে (২০ ফুট সমমানের কনটেইনার) উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ও সার্বিক কর্মসূচির বিবরণ দিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুর ইসলাম জানান, সফরকালে মোংলা বন্দর অবকাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পাশাপাশি ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ এবং ‘চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন’-এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এই চুক্তির ফলে মোংলা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি রেল সংযোগ তৈরি হবে, যার মাধ্যমে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি থেকে ছেড়ে আসা কন্টেইনারবাহী ট্রেন সরাসরি মোংলা বন্দরে গিয়ে নামবে এবং সেখান থেকে জাহাজে পণ্য লোড-আনলোড করা যাবে। এতে পরিবহন খরচ ও সময় অনেকাংশে কমে আসবে এবং দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের মোংলা বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ ও বিনিয়োগ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আলী আসগর লবি ইনকিলাবকে বলেন, মোংলা বন্দরকে আরো গতিশীল ও আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিক হাবে রূপান্তর করতে সরকার বড় ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চার হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক সুবিধা-সংবলিত দুটি নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণের মাধ্যমে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রীর এ সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়; বরং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বিশেষ করে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদীপথের নাব্যতা রক্ষা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মধ্য দিয়ে মোংলা বন্দরকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব এবং খুলনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টির প্রত্যাশা করছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ।

মোংলায় দিনব্যাপী সরকারি ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে বাগেরহাটের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে তিনি বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদাপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত এ মাজার জিয়ারত তাঁর সফরসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মাজার জিয়ারত শেষে প্রধানমন্ত্রী খুলনায় পৌঁছাবেন। সেখানে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি সিজন-২’-এর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন তিনি। শিশু-কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানকে ঘিরে খুলনায় উৎসব মুখর পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি এটিএম আকরাম হোসেন তালিম জানান, দলীয় প্রধান তথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে নেতাকর্মীরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই সফর ঘিরে বিপুল আগ্রহ ও স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যাচ্ছে, যা এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে নতুন গতি আনবে।

অন্যদিকে সফরের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জামিরুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলিত করতে চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রশাসন ও পুলিশ সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।