বন্যার স্রোত আসতে দেখেই ছুটির ঘণ্টা-প্রধান শিক্ষকের দূরদর্শিতায় ১৬৪৩ শিক্ষার্থীর প্রাণ রক্ষা


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : আগস্ট ৩০, ২০২৬, ৬:১৬ অপরাহ্ণ /
বন্যার স্রোত আসতে দেখেই ছুটির ঘণ্টা-প্রধান শিক্ষকের দূরদর্শিতায় ১৬৪৩ শিক্ষার্থীর প্রাণ রক্ষা

ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাদাবি।

নেপালের এই মহাবিপর্যয়ের মাঝেও স্বর্গদূত রূপে আবির্ভুত হয়েছিলেন কেউ কেউ। তাদেরেই একজন ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাদাবি। ভয়াবহ পাহারি বন্যার স্রোত পানি স্কুলের দিকে ধেয়ে আসছে—এমন সতর্কবার্তা পেয়েই এক মুহূর্তও দেরি না ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দ্রুত স্কুল থেকে বের করে দেন তিনি। তার সেই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তেই প্রাণে বেঁচে যায় ১ হাজার ৬৪৩ শিশু।

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল ৯টা ২০ মিনিটে এক বন্ধুর কাছ থেকে ফোন পান নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দাওয়াদি। তাকে জানানো হয়, পাহাড়ি নদীতে ভয়াবহ স্রোত নেমে আসছে এবং গ্রামের পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হচ্ছে।

বন্ধু তাকে বলেছিলেন, ‘গ্রামটি আর নেই, নদী সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমাকে দৌড়াতে বলেছে।’ তখন তিনতলা স্কুল ভবন ও এর আশপাশে ছিল ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থী। হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় এরই মধ্যে পাহাড়ি নদীগুলো ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।

৪৭ বছর বয়সি ইংরেজির শিক্ষক দাওয়াদি প্রথমে ভেবেছিলেন, স্কুলটি নিরাপদ। কংক্রিটের তৈরি ভবনটি নদীর চেয়ে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে ছিল। এমনকি গ্রামের সঙ্গে নদীর পূর্ব তীরের সংযোগকারী স্টিলের সেতুটিও স্কুলের সমান উচ্চতায় ছিল। কিন্তু এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ছুটে এসে জানান, পানি খুব দ্রুত বাড়ছে।

দাওয়াদি সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ খালি করার নির্দেশ দেন। তিনি স্কুলবাসের চালকদের ফোন করে বাস ঘুরিয়ে আনতে বলেন। তবে একজন চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর নিজের চোখেই দেখেন, সেই বাসটি সেতু পার হচ্ছে।

এরই মধ্যে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে, তারা বড় বিপদের মধ্যে পড়েছে। এক ছাত্রী আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে উঁচু এলাকায় নেওয়া হয়। অন্যরা দৌড়ে নিরাপদ স্থানের দিকে ছুটতে থাকে। তাদের পেছন পেছন ছুটছিলেন দাওয়াদিও।

শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা একটি বোধিবৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়। আর সেই সময় ভয়ংকর স্রোত তাদের স্কুল ভবনসহ আশপাশের স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দাওয়াদির দ্রুত সিদ্ধান্তে ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-কর্মীদের প্রায় সবাই প্রাণে বেঁচে যান।

তবে স্কুলের সমাজবিজ্ঞান শিক্ষক ৩২ বছর বয়সি সান্তোষ পারিয়ার বাঁচতে পারেননি। নদীর পাশে ভাড়া বাসায় নাশতা রান্না করতে ফিরে গিয়ে তিনি স্রোতে ভেসে যান। স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুলতান লামাও দরজা বন্ধ করতে ফিরে গিয়ে প্রাণ হারান।

স্থানীয় বাসিন্দারা দাওয়াদিকে নায়ক হিসেবে দেখছেন। কিন্তু নিজেকে নায়ক মনে করেন না তিনি। ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্কুলের কাদামাখা ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে ৪৭ বছর বয়সী প্ধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি মনে করেন, ‘তার ভূমিকা ছিল আর দশজনের মতোই সাদামাটা’।

রূপালি পর্দার কল্পকাহিনীকেও হার মানানো এই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা উঠে এসেছে দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে। ফুটে তোলা হয়েছে শিক্ষকের মহা কৃতিত্বের কথাও। সাম্প্রতিক বন্যায় নেপালে এখন পর্যন্ত ৭৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে প্রায় ২ হাজার ৪৯৮ জন এখনো নিখোঁজ। তিব্বতের গিয়েরং কাউন্টিতেও নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৪৬ জন।