

দুই দেশের সম্পর্ক সহজীকরণের স্বার্থে ভারতে পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যান্য সব আসামিদের ফেরত দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সরকারের এই অবস্থানের কথা জানান তিনি। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনারের সাথে অনুষ্ঠিত সৌজন্য সাক্ষাতেও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করা হয়েছে।
তথ্যউপদেষ্টা বলেন, হাই কমিশনারের সাথে সাক্ষাতে শেখ হাসিনাসহ ভারতে পলাতক সব আসামিদের ফিরিয়ে আনার ইস্যুটি আমরা আমাদের জায়গা থেকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছি। আমরা জানিয়েছি যে বাংলাদেশের সাথে একটি কার্যকর সম্পর্ক (ওয়ার্কিং এনগেজমেন্ট) জোরদারের স্বার্থে এই বিষয়টি ভারত সরকারকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। শেখ হাসিনাকে ফেরানোর পাশাপাশি ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যান্য আসামিদের ফেরানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনাকেই চাইছি, তাহলে ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যদের চাইব না কেন? ভারত সরকারের কাছে আমাদের আহ্বান-বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক সহজীকরণ করার স্বার্থে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। শেখ হাসিনার যে বর্বরতা, তা কেবল জুলাইয়ে এসে সীমাবদ্ধ ছিল না, তার বর্বরতা বছরের পর বছর চলেছে। এগুলোর সাথে নানা মানুষ জড়িত ছিল। পলাতক আসামিদের ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, তারা দেশের বাইরে বসে আরাম-আয়েশের জীবনযাপন করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বক্তব্য বা নসিহত প্রসব করছে, যা বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিতে চরম আঘাত হানছে। আমরা আশা করি, ভারত সরকার বাংলাদেশের মানুষের এই অনুভূতি ও সেনসিটিভিটি বুঝবে এবং তাদেরকে হস্তান্তর করবে। আওয়ামী শাসনামলের সকল অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী মাফিয়া শাসনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দলটিই এখন রাষ্ট্রের দায়িত্বে রয়েছে। বিচার নিশ্চিতের বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না। বিচার পাওয়ার স্বার্থে অভিযুক্ত যে কেউ আদালতে আসতে পারেন, কারণ বর্তমানে দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ বলেন, সংবিধানে জাতীয় ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্বাধীন হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন ও সরকার সমন্বয় করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক হবে। সেখানে কোনো দলীয় প্রতীক থাকবে না। মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর তথ্যের ব্যাখ্যা দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ১০ হাজার কর্মী বিনামূল্যে যাওয়ার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সঠিক রয়েছে।
এছাড়া কোনো অফিসে ‘স্যার’ বলাকে বাধ্যবাধকতা না বানিয়ে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের তাগিদ দেন তিনি। সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন,অটোরিকশার সাথে বহু মানুষের জীবিকা ও যাতায়াত জড়িত। সরকার এগুলো একবারে বন্ধ করতে চায় না, তবে সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও রুটের আওতায় আনতে দ্রুত একটি নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার করসংক্রান্ত মামলায় সরকারের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। তাই মামলাটি আদালতের নিজস্ব গতিতেই চলবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বা অন্য কারোর প্রতি সরকারের অনুরাগ কিংবা বিরাগের প্রশ্নও এখানে নেই।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার করসংক্রান্ত বিষয়, হাইকোর্টের আদেশ এবং এ নিয়ে করা দুটি রিটের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। একইসঙ্গে গ্রামীণ কল্যাণের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে সরকারের কোনো বিশেষ বার্তা রয়েছে কি না, তা জানতে চান। জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি আদালতের। এ নিয়ে কিছুটা ভুল ধারণা ছিল। এখন বিস্তারিতভাবে বিষয়টি অনেকের সামনে এসেছে—কর মওকুফের বিষয়ে আদালতের রায় কী ছিল এবং কেন তখন সেই রায় কার্যকর হয়নি।
তিনি বলেন, ওই সময়ে ইন্টারিম (অন্তর্বর্তী) সময় ছিল। এখন আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের কর পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। আদালতের রায় অনুযায়ী তাদের ওই কর দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, এটি আদালতের বিষয় এবং হাইকোর্টের রায় হয়েছে। সেই রায় অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের কর পরিশোধ করতে হবে। তাহারা নিজেরাই বাদী হয়ে ওই কর দিতে চাননি। এখানে সরকারের আসলে কিছু করার নেই। মামলার পরবর্তী কার্যক্রমও আদালতের নিয়ম অনুযায়ী হবে জানিয়ে তিনি বলেন, মামলা এখন নিজস্ব গতিতে চলবে। সংশ্লিষ্টরা চাইলে বিষয়টি নিয়ে আপিল বিভাগে যেতে পারেন। সেখানে তাদের অবস্থান টেকসই না হলে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কর পরিশোধ করতে হবে। গ্রামীণ কল্যাণের এ মামলায় সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। জাহেদ উর রহমান বলেন,সরকারের কোনো রকম ইনভলভমেন্ট নেই। ড. ইউনূস বা অন্য কারোর প্রতি সরকারের অনুরাগ কিংবা বিরাগের প্রশ্নও এখানে নেই। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এটি যেহেতু বিচার বিভাগের বিষয়, তাই সরকার বিশ্বাস করে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে যে দায়িত্ব পালনের কথা, সেটিই করছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে। ব্রিফিংয়ে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. আলম মোস্তফা উপস্থিত ছিলেন।
আপনার মতামত লিখুন :