

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ মূলত কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। অথচ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চল যশোরে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নেই। যশোরে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, শিক্ষা, গবেষণা ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে।
কেন যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন?
যশোর ও আশপাশের জেলা কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধান, সবজি, ফুল, ফল, মাছ, প্রাণিসম্পদসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে এ অঞ্চলের রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। বিশেষ করে যশোরের গদখালী ও পানিসারা অঞ্চল দেশের ফুলচাষের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং “ফুলের রাজধানী” হিসেবে পরিচিত।
গদখালীর বিস্তীর্ণ মাঠে গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা, জারবেরা, গ্লাডিওলাসসহ বিভিন্ন জাতের ফুল উৎপাদিত হয়। ফুলচাষকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। দেশের ফুলের চাহিদা পূরণে গদখালী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কিন্তু আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, উন্নত জাত উদ্ভাবন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে আরও উচ্চতর গবেষণা প্রয়োজন। একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রয়োজন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
🌸 ফুলের রাজধানী যশোরের জন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন জরুরি?
ফুল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কৃষিপণ্য ও সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত। গদখালীর ফুলচাষকে আরও আধুনিক ও লাভজনক করতে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ফুলের নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক চাষাবাদ, ফুলের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি, মানসম্মত চারা উৎপাদন, প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে ফুলের প্রক্রিয়াজাতকরণ, মূল্য সংযোজন ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি নিয়েও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে গদখালীর ফুল দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ, “ফুলের রাজধানী” যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে ফুলচাষ শুধু কৃষকের জীবিকা নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষিভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানি খাতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।
যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হলে যে সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে:
১. কৃষি গবেষণার নতুন কেন্দ্র তৈরি হবে: স্থানীয় মাটি, পানি, আবহাওয়া ও কৃষি ব্যবস্থার ওপর গবেষণা করে যশোরের উপযোগী নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে।
২. কৃষকের উৎপাদন ও আয় বাড়বে: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে কাজ করলে আধুনিক চাষাবাদ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন খরচ কমানোর বিষয়ে কার্যকর পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হবে।
৩. ফুলচাষের আধুনিকায়ন হবে: গদখালীর ফুলচাষিদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাত, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
৪. কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি হবে: কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করবে না; কৃষি উদ্যোক্তা, কৃষি প্রযুক্তিবিদ, গবেষক ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসায়ী তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করবে।
৫. দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সুযোগ বাড়বে
যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা, কুষ্টিয়াসহ আশপাশের জেলার শিক্ষার্থীরা নিজ অঞ্চলে কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে।
৬. কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন ও রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে: কৃষিপণ্য ও ফুল প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও আন্তর্জাতিক বাজারজাতকরণ নিয়ে গবেষণা হলে যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্যের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
৭. জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে: লবণাক্ততা, খরা, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো সমস্যার উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি ও ফসলের জাত উদ্ভাবনে বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৮. কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে:
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে শিক্ষক, গবেষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি আবাসন, পরিবহন, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও সেবা খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
যশোরই কেন উপযুক্ত?
যশোর ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে কৃষি উৎপাদন, কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফুলের রাজধানী গদখালী এই জেলার কৃষির একটি অনন্য পরিচয় বহন করে।
যশোরের কৃষি, ফুল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখানে একটি আধুনিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত যৌক্তিক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যশোরের সড়ক, রেল ও আকাশপথে যোগাযোগ রয়েছে। ফলে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য যশোর একটি সম্ভাবনাময় স্থান হতে পারে।
আমাদের দাবি:
যশোরে একটি আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হোক। শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নয়—এর সঙ্গে কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, কৃষি গবেষণা, মাটি পরীক্ষা, কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে।
বিশেষ করে গদখালীর ফুলচাষকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষায়িত ফুল গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হলে যশোরের ফুলচাষ আরও আধুনিক, লাভজনক ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে না; বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন, ফুলচাষ, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
তাই সময়ের দাবি—
“যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চাই”- এটি কোনো ব্যক্তির একক দাবি নয়; এটি হতে পারে কৃষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক, কৃষি উদ্যোক্তা ও সর্বস্তরের মানুষের একটি যৌক্তিক উন্নয়ন দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান—যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
যশোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চাই—কৃষির জন্য, কৃষকের জন্য, ফুলচাষির জন্য, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
মোঃ মেহেদী হাসান, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, কন্দর্পপুর গণগ্রন্থাগার, শার্শা, যশোর।
আপনার মতামত লিখুন :