

শেখ নাজমুল ইসলাম
মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলছে। তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রের নানা উদ্যোগ ও প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। অথচ চলতি অক্টোবরেই কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের তিরোধান দিবস ও স্মরণোৎসবকে ঘিরে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে—আইনের প্রয়োগ কি সর্বত্র সমান?
বাংলার মরমি সাধক ও বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলেও ১৮৯০ সালে তাঁর প্রয়াণ ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তাঁকে স্মরণ করে সাধুসঙ্গের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। লালনের দর্শন মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার শিক্ষা দেয়। এই ঐতিহ্য দেখতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ ছুটে আসেন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই আয়োজনকে ঘিরে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালের লালন মেলায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। চলতি বছরও স্মরণোৎসবের আগে মাদক ব্যবসার অভিযোগে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে মেলাকে মাদকমুক্ত রাখা এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সারাদেশে যখন মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, তখন লালন মেলার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে ঘিরে যদি পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা ও সেবন চলতে থাকে, তবে সেটি হবে আইনের প্রয়োগ ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বড় প্রশ্ন। পুলিশ পাহারায় মাদক ব্যবসা চলছে-এমন অভিযোগ সত্য হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর উপস্থিতি অপরাধীদের দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না।
একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে মাদক পাওয়া গেলে তাঁকে আইনের মুখোমুখি হতে হয়। অথচ বড় কোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে একই ধরনের অপরাধের অভিযোগ উপেক্ষিত হলে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—আইন কি স্থান, সময় ও পরিচয়ভেদে ভিন্নভাবে প্রয়োগ হয়? মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান যদি সর্বজনীন হয়, তাহলে লালন মেলার ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে।
এখানে মনে রাখা জরুরি, লালনের মানবতাবাদী দর্শনের সঙ্গে মাদককে এক করে দেখার সুযোগ নেই। মেলা, সাধুসঙ্গ ও বাউল সংস্কৃতিকে মাদকের দায়ে অভিযুক্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি এই ঐতিহ্যের আড়ালে মাদক ব্যবসা বা সেবনের অভিযোগ থাকলে তা উপেক্ষা করাও দায়িত্বহীনতা। প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, নিয়মিত নজরদারি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইনগত ব্যবস্থা।
তাই প্রশাসনের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন: লালন মেলাকে মাদকমুক্ত রাখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের অভিযোগ পাওয়া গেলে কীভাবে তদন্ত করা হবে? পুলিশের উপস্থিতিতে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে কি?
লালনের স্মরণোৎসব হোক মানবতা, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মিলনমেলা—মাদকের অবাধ বিস্তারের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ কোনো আয়োজন নয়। সারাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আর লালন মেলায় সম্ভাব্য ব্যতিক্রমী আচরণ—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে যেন কোনো বৈপরীত্য না থাকে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। অন্যথায় মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান কেবল প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকবে, আর মানুষের মনে জন্ম নেবে বৈষম্য ও অবিশ্বাস।
আপনার মতামত লিখুন :