সরকারি দপ্তরে নয়, রাজনৈতিক সমর্থনের প্রতিফলন ব্যালট বাক্সে ঘটাতে হবেঃ প্রধানমন্ত্রী


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৮, ২০২৬, ৯:৩৩ অপরাহ্ণ / ০
সরকারি দপ্তরে নয়, রাজনৈতিক সমর্থনের প্রতিফলন ব্যালট বাক্সে ঘটাতে হবেঃ প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী। ছবিঃ সংগৃহীত  

সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কোনো দলের প্রতি সমর্থন থাকতেই পারে, তবে তার প্রতিফলন সরকারি দপ্তরে নয়, ব্যালট বাক্সে ঘটাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দক্ষতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় দিতে হবে। নাগরিকেরা সরকারি সেবা নিতে এসে যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

রোববার ৮১তম ফাউন্ডেশন ট্রেনিং কোর্স বা বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি নতুন কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য কামনা করেন এবং অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাডেমিক জ্ঞান অর্জনের পর ব্যবহারিক জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগের কলাকৌশল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মকর্তারা শিখেছেন। এখন সরকারি প্রশাসনে যার ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হবে, অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মজীবন শুরু করতে যাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য এটি জীবনের অন্যতম আনন্দময় মুহূর্ত।

তিনি বলেন, সরকারি প্রশাসন যত বেশি দক্ষ হবে, সরকারের কার্যক্রমও তত বেশি সফল হবে। একটি সরকারের সার্বিক সফলতার জন্য দক্ষতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রশাসন জরুরি। এসব গুণ শুধু একজন কর্মকর্তাকেই সমৃদ্ধ করে না, রাষ্ট্র ও সরকারকেও সমৃদ্ধ করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে ২৬টি ক্যাডার রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে কেউ প্রশাসন, কেউ পররাষ্ট্র, কেউ কৃষি, কর, শিক্ষা কিংবা তথ্য ক্যাডারে যোগ দেবেন। ক্যাডারভেদে কাজের ধরন ও কর্মস্থল আলাদা হলেও সবার প্রথম ও প্রধান পরিচয় তাঁরা জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা। তাঁদের মূল দায়িত্ব জনগণের সেবা করা।

নতুন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, তা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, এসব বিষয় তাঁরা নিজেরাই জানেন। বরং জানা বিষয়গুলো কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সদিচ্ছা থাকাটাই বেশি জরুরি। সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর প্রত্যাশা, যেকোনো বয়সের একজন নাগরিক সহযোগিতার জন্য সরকারি দপ্তরে গিয়ে যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন।

এ প্রসঙ্গে একটি ‘গোল্ডেন রুল’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্যের সঙ্গে তেমন আচরণ করুন, যেমন আচরণ আপনি নিজের জন্য প্রত্যাশা করেন।’ জীবনের বিভিন্ন সময়ে নিজেরও অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। সে সময় অন্যের কাছ থেকে যে ধরনের ব্যবহার প্রত্যাশা করা হয়, কেউ সহযোগিতার জন্য এলে তাঁর সঙ্গেও একই ধরনের আচরণ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে বিধিবদ্ধ নিয়মের আওতায় সব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে কোনো নাগরিকের সঙ্গে কাজ করার সময় তাঁর প্রতি মানবিক আচরণ করা হচ্ছে কি না, আধুনিক রাষ্ট্র ও প্রশাসনে সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি আবেদনপত্রে ভুল থাকলে আবেদনকারীকে তা সংশোধন করে আনতে বলা বেআইনি বা অন্যায় নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু ‘আবেদনপত্রে ভুল রয়েছে, ঠিক করে আনুন’ বলার পরিবর্তে কোথায় ভুল হয়েছে, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়া এবং কোথায় বা কার কাছে গিয়ে তা সংশোধন করা যাবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া উচিত। এ ধরনের আচরণই মানবিকতা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। দেশের মানুষ সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শুধু আদেশ-নির্দেশ নয়, মানবিকতাও প্রত্যাশা করে।

পছন্দের পদে পদায়ন বা পদোন্নতির জন্য পেশাগত দক্ষতা ও সততার সঙ্গে আপস না করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনপ্রশাসনে হাজার হাজার পদ-পদবি রয়েছে। প্রতিটি পদই রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় পছন্দের পদে পদায়ন কিংবা পদোন্নতির জন্য কেউ কেউ নিজেদের পেশাগত দক্ষতা ও সততার সঙ্গে আপস করেন। দেশের যেকোনো স্থানে, জনপ্রশাসনের যেকোনো পদে দায়িত্ব পালনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকাই চূড়ান্ত পেশাদারিত্বের পরিচয়। একটি সরকার যেমন চিরস্থায়ী নয়, জনপ্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।

রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন থাকাকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দোষের মনে করেন না। তবে সেই সমর্থনের প্রতিফলন ঘটতে হবে ব্যালট বাক্সে, সরকারি অফিসে নয়।

বর্তমান সরকারও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার জনপ্রশাসনের মাধ্যমেই এসব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। তবে এর সঙ্গে অতীতের পার্থক্য হলো, এসব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই জনগণ ভোট দিয়ে বর্তমান সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে জনগণের সামনে নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরা হয়েছিল। জনগণ সেই ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে নির্বাচনী ইশতেহার এখন দেশের জনগণের ইশতেহার ও দলিল। এটি বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজ আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পন্ন করাই কর্মকর্তাদের কাছে সরকারের প্রত্যাশা।

সরকারি সেবাকে আরও সহজ ও নাগরিকবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইতিবাচক মানসিকতা এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।

সবশেষে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ঘরবাড়ি, অফিস-আদালতসহ চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পরিচ্ছন্ন দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।