শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন: জবাবদিহিমূলক নিরপেক্ষ জনপ্রশাসনের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : মে ৪, ২০২৬, ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ /
শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন: জবাবদিহিমূলক নিরপেক্ষ জনপ্রশাসনের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শুরু হয়েছে। সম্মেলনে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষতার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়।

বদলি ও পদোন্নতিতে তদবির না করার কথা গুরুত্ব পায় গতকালের সম্মেলনে। নিরপেক্ষতা বজায় রেখে দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করতে নির্দেশ পেয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। তারা মাঠ পর্যায়ের অ্যাম্বাসেডর এমন আখ্যা দিয়ে বাজার তদারকিসহ নানা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় সরকারপ্রধানের তরফ থেকে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে সচিবালয়ের নিজ দপ্তর থেকে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আসেন। এ সময় রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান।

প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিগত জাতীয় নির্বাচনে জনপ্রশাসনের যারা পেশাদারত্বের পরিচয় দিয়ে জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। চার দিনব্যাপী এ সম্মেলন শেষ হবে ৬ মে।

বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের উপস্থিতিতে সরকারপ্রধান বলেন, এ সম্মেলন কেবল আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়ের জায়গা হওয়া উচিত নয়, বরং এটি এমন একটি পরিসর, যেখানে মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজন এবং উদ্ভাবনী চিন্তা সরাসরি জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হতে পারে বা হওয়া উচিত। জনগণকে দেওয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের তৎপর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

জেলা প্রশাসকরা জানান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গ্রামীণ জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ জনগণের শহরমুখিতা হ্রাস এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নিয়ামক হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কার্যকর, নিয়মিত এবং দৃশ্যমান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সরকারি কার্যালয়ে গিয়ে সেবা প্রার্থীরা যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার না হয় কিংবা বিলম্ব বা অনিয়মের শিকার না হয়, সে ব্যাপারে ডিসিদের কঠোর নজর রাখতে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

চার দিনব্যাপী এ সম্মেলনে মোট অধিবেশন হচ্ছে ৩৪টি। এর মধ্যে কার্য অধিবেশন ৩০টি এবং অংশগ্রহণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সংখ্যা হচ্ছে ৫৬টি। সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের ৪৯৮টি প্রস্তাব উত্থাপিত হচ্ছে। ৫৬টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা সম্মেলনে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন।

গতকাল সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর দুপুর সোয়া ২টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও আওতাধীন সংস্থাগুলোর অধিবেশন ছিল। দ্বিতীয় অধিবেশনে ছিল স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, তৃতীয় অধিবেশনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং চতুর্থ অধিবেশনে আইন ও বিচার বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের পর্ব।

সম্মেলনের নির্ধারিত পর্বশেষে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা ব্রিফ করেন। জেলা প্রশাসকদের পক্ষ দেওয়া বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। তাদের বক্তব্য নোট নিতেও দেখা যায়।

চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যয় সংকোচন নীতিতে চলছে নতুন সরকার। কমানো হয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ ও আপ্যায়ন খরচ। বন্ধ ভূমি অধিগ্রহণ, গাড়ি কেনা বা নতুন ভবন নির্মাণ খাতের বরাদ্দ। এ অবস্থার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের সব ধরনের মেডিক্যাল খরচ বিনামূল্যে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক।

আজ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে উঠছে এ প্রস্তাব। একইদিনে রাজস্ব আয় বাড়াতে দেশের সব জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনে মাগুরা জেলা প্রশাসকের প্রস্তাবটি উঠছে। বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাব কমাতে জেলা পর্যায়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠায় মত দেন নোয়াখালী ও ফেনীর জেলা প্রশাসক।

এদিকে গতকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘ইতোমধ্যে একটি নীতিমালার ভিত্তিতে জনপ্রশাসন অর্থাৎ আপনাদের মাধ্যমেই কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, স্পোর্টসের বিষয়টিসহ দেশে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদেরও প্রতি মাসে আমরা সম্মানীর ব্যবস্থা করেছি। আপনাদের মাধ্যমে এ কার্যক্রমগুলো শুরু হয়েছে।’

তিনি বলেন, আমাদের মেনিফেস্টো এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা, প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে চাই। আমরা এ ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। আমি আশা করব, আপনারা মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।

একইসঙ্গে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত আইনকানুন ও জটিলতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবসম্মত, কার্যকর ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতা আমরা প্রশাসনের সব পর্যায়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি, যাতে জনগণ সরকারের প্রতিটি কর্মসূচির প্রত্যাশিত সুফল সময়মতো লাভ করতে পারে।

স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় ও উদ্যোগী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য মাঠ পর্যায়ের এ শীর্ষ কর্মকর্তাদের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এর মাধ্যমে জনপ্রশাসনকে গণমুখী করা গেলে জনগণ সরকারের কার্যক্রমের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে না মনে করেন তিনি।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, ‘জনপ্রশাসন সঠিকভাবে কাজ করলে অবশ্যই জনগণের রায় যে প্রতিফলিত হয়, সেটি আপনারা প্রমাণ করেছেন গত ১২ তারিখের নির্বাচনে। অপরদিকে যদি আপনাদের কাজ করতে না দেওয়া হয়, তাহলে কী হতে পারে, সেটিও আমরা ১৪, ১৮ বা ২০২৪ সালে দেখেছি।’

এদিকে সম্মেলন থেকে বেরিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের কেউ বাদ পড়বে না।