মার্কিন ট্রেজারিকে টপকিয়ে এবার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ সম্পদে এখন স্বর্ণ


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জুন ৫, ২০২৬, ৪:২৪ অপরাহ্ণ /
মার্কিন ট্রেজারিকে টপকিয়ে এবার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ সম্পদে এখন স্বর্ণ

এআই নির্মিত ছবি

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা খেলো মার্কিন ট্রেজারি তথা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ড। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ সম্পদের তালিকায় মার্কিন সরকারি বন্ড বা ট্রেজারিকে ছাড়িয়ে শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে স্বর্ণ। টানা কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ কেনা এবং গত দুই বছরে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে এই পরিবর্তন ঘটেছে।

ইসিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট বৈশ্বিক রিজার্ভ সম্পদের ২৭ শতাংশই ছিল স্বর্ণ, যা এক বছর আগে ছিল ২০ শতাংশ। একই সময়ে মার্কিন ট্রেজারির অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে রিজার্ভ হিসেবে ইউরোর হিস্যা ১৫ শতাংশেই স্থির রয়েছে।

মূলত বিভিন্ন দেশের ডলারের বিকল্প খোঁজার প্রবণতার কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের গঠনে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে । ইসিবি সভাপতি ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড প্রতিবেদনে বলেন, “ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার প্রবণতাকে জোরালো করেছে।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুদ বৃদ্ধি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর হাতে ৩৬ হাজার টনেরও বেশি স্বর্ণ মজুদ রয়েছে। এটি প্রায় ব্রেটন উডস যুগের (যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা স্বর্ণভিত্তিক ছিল) ৩৮ হাজার টনের কাছাকাছি। সে সময় মার্কিন ডলারের মান স্বর্ণের সঙ্গে নির্ধারিত ছিল এবং বৈশ্বিক মুদ্রা বিনিময় হার ছিল স্থির।

ইসিবি আরও জানায়, স্বর্ণের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়াও এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে সর্বকালীন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। ডলার এখনও শীর্ষে, তবে চাপ বাড়ছে, তবে সামগ্রিকভাবে ডলার-নির্ভর সম্পদ এখনও বৈশ্বিক রিজার্ভের সবচেয়ে বড় অংশ, যা মোটের ৪২ শতাংশ।

ইসিবি জানায়, ২০২৫ সালে স্বর্ণ কেনার গতি কিছুটা কমে এসেছে। গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট ৮৫০ টন স্বর্ণ কিনেছে, যা আগের তিন বছরে বার্ষিক এক হাজার টনের বেশি কেনার তুলনায় কম। ২০২২ সাল থেকে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ মজুদ বৃদ্ধি করেছে চীন, পোল্যান্ড, তুরস্ক ও ভারত। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, স্টেবলকয়েন কোম্পানি টেথার ২০২৫ সালে একাই ১০০ টনেরও বেশি স্বর্ণ কিনে সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়েছে।

তুরস্কের রিজার্ভে বড় পরিবর্তনঃ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তুরস্ক ২২০ টন স্বর্ণ মজুদ বাড়ালেও পরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। ২০২৬ সালের শুরুতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দেশটি ১৩০ টন স্বর্ণ বিক্রি বা ঋণ হিসেবে দিয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় রিজার্ভ হ্রাস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইউরোর অবস্থান ও বৈশ্বিক আর্থিক প্রবাহঃ ইসিবি আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থায় ইউরোর ভূমিকা ধীরে ধীরে বাড়ছে। গত বছর ইউরো-নির্ধারিত আন্তর্জাতিক ঋণ ইস্যু প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইউরো অঞ্চলের সম্পদে ৮৫০ বিলিয়ন ইউরো নেট বিনিয়োগ করেছেন, যা ইউরো চালুর পর অন্যতম সর্বোচ্চ প্রবাহের মধ্যে একটি।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণঃ বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণমুখী ঝোঁক এবং মার্কিন ট্রেজারির ওপর নির্ভরতা হ্রাস বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে একটি বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মুদ্রা ঝুঁকি এ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। সূত্র: ফিনান্সিয়াল টাইমস