

শেখ নাজমুল ইসলামঃ ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এই অঞ্চলে ফুটবলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। দেশ ভাগের পর ঢাকা কেন্দ্রিক ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সেই সময়ে ঢাকা স্টেডিয়াম ছিল ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র। মোহামেডান, ভিক্টোরিয়া, ওয়াপদা এবং ইপিআইডিসি-র মতো ক্লাবগুলো তখন দারুণ জনপ্রিয় ছিল।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের ফুটবল একটি জাতীয় সত্তা পায়। ১৯৭২ সালে প্রথম জাতীয় ফুটবল দল গঠিত হয়। ১৯৭৩ সালে ঢাকা মোহামেডান এবং ভারতীয় ক্লাব ইষ্ট বেঙ্গলের মধ্যে ম্যাচ দিয়ে দেশের ফুটবলে নতুন জোয়ার আসে।
আশির দশক ছিল বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় সময়। ঢাকা লীগ ছিল তৎকালীন উপমহাদেশের অন্যতম সেরা লীগ। আবাহনী ক্রীড়া চক্র এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যকার লড়াই দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শক মাঠে ভিড় করত। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ । এটি ছিল দেশের ফুটবলের একটি বিশাল অর্জন। সে সময়ে কাজী সালাউদ্দিন, আসলাম, কায়সার হামিদ, মোনেম মুন্না এবং গোলরক্ষক মহসিন ছিলেন ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তী।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ফুটবলের মান কিছুটা নিম্নমুখী হতে থাকে। তবে ২০০০ সালের পর থেকে ফুটবলে পেশাদারিত্ব আনার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৭ সালে ‘বি. লিগ’ চালুর মাধ্যমে দেশে পেশাদার ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়, যা বর্তমানে ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ’ হিসেবে পরিচিত। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সাফ (SAFF) চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে, যা দেশের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে গণ্য হয়।
নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই ঘরোয়া ফুটবলের জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকার কারণ হিসেবে ধরা যায় আবাহনী, মোহামেডানসহ ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলো সময়ের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ব্যর্থতা। তারা আধুনিক ক্লাব ম্যানেজমেন্ট, ফ্যানবেজ তৈরি বা বাণিজ্যিক পণ্য বিপণনের (মার্চেন্ডাইজিং) দিকে কোনো নজর দেয়নি। তাছাড়া নব্বই এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ডিশ এন্টেনার কল্যাণে মানুষ ইউরোপীয় ফুটবলের মানসম্মত খেলা দেখার সুযোগ পায়। ফলে ঘরোয়া ফুটবলের মান নিয়ে দর্শকদের মনে প্রশ্ন দেখা দেয় এবং তারা ড্রয়িংরুমে বসেই উন্নত ফুটবল উপভোগে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একই সময়ে বাংলাদেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং ক্রিকেট বোর্ড অবকাঠামো ও সাফল্যের দিক থেকে ফুটবলের চেয়ে বেশি এগিয়ে যায়, যা দর্শকদের মনোযোগ সরিয়ে নেয়।
এর পরে দায় এসে দাড়ায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এবং ক্লাবগুলোর উপর। এদের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদী পেশাদার পরিকল্পনা, তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তৈরির অবকাঠামো (একাডেমি) এবং নিয়মিত লিগ আয়োজনে ধারাবাহিকতার অভাব ফুটবলের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে সর্বাধিক ৪৮টি দল অংশ নিয়েছিল। ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালীন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা অন্য দেশের পতাকা ওড়ানোর উন্মাদনা বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতির এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের মানুষের রক্তে ফুটবল মিশে আছে। এই আবেগ ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা জিইয়ে রাখে এবং তরুণ প্রজন্মকে খেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখে।
তবে, অনেক সময় এই আবেগ নিজ দেশের ফুটবলের প্রতি উদাসীনতা তৈরি করে। এছাড়া, বিদেশি পতাকার ব্যাপক প্রদর্শন জাতীয় পতাকার মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে কি না, তা নিয়ে সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। তবে, এই উন্মাদনা যদি নিজের দেশের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় রূপান্তর করা যায়, তবেই তা ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য সুফল বয়ে আনবে। বাড়তে পারে দেশের সুনাম সুখ্যাতি।
বাংলাদেশের ফুটবলের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদী ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। কেবল ক্লাব বা জাতীয় দলের ওপর নির্ভর না করে সারা দেশে ফুটবল একাডেমি গড়ে তুলতে হবে। উন্নত বিশ্বে যেভাবে তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় গড়ে তোলা হয়, সেই মডেল অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে কোচ না এনে বরং রাষ্ট্রীয় খরচে ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সী তরুণ সম্ভাবনামায় ফুটবলারদের বিদেশ থেকে ৩ বা ৫ বছরের প্রশিক্ষণ করিয়ে আনতে হবে।
এরপর ঘরোয়া লীগকে ক্রিকেটের আইপিএল বা আইসিএল-এর মতো একটি বাণিজ্যিক ও প্রতিযোগিতামূলক পণ্যে রূপান্তর করতে হবে। স্পনসর আকর্ষণ করতে না পারলে ক্লাবের টিকে থাকা কঠিন। সেক্ষেত্রে বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীকে ফুটবলে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করতে হবে।
মানসম্মত ও দক্ষ খেলোয়ার তৈরিতে বাফুফে এবং ক্লাব গুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করতে হবে। নিয়োগ ও বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে মেধার মূল্যায়ন করতে হবে ।
ফুটবলে আমাদের প্রতিভা বা আবেগ কোনোটিরই অভাব নেই; অভাব কেবল একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর। সঠিক পরিকল্পনা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে খেলোয়াড় তৈরির উদ্যোগ নেওয়া গেলে বাংলাদেশের ফুটবলের সুদিন আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আমাদের স্বপ্ন কেবল গ্যালারিতে বিদেশি দলের পতাকা ওড়ানো নয়, বরং একদিন নিজেদের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে উড্ডীন দেখার হওয়া উচিত।
আপনার মতামত লিখুন :