

বাংলাদেশের উত্তর জনপদের জীবন-মরণ সমস্যা তিস্তা নদীর সংকট নিরসনে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ (টিআরসিএমআরপি) যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়নে ঢাকার অনড় ও আপসহীন অবস্থান এবং এতে বেইজিংয়ের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নয়াদিল্লির নীতি-নির্ধারকদের মনে তীব্র ভীতি ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ভারতের দীর্ঘদিনের অন্যায় আপত্তি, দাদাগিরি এবং নানামুখী কৌশলগত চাপকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশ তার এই অভ্যন্তরীণ প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে যাচ্ছে। ঢাকার এই স্বাধীন ও দৃশ্যমান তৎপরতায় ভারতের নীতি-নির্ধারক ও কৌশলগত মহলে আক্ষরিক অর্থেই ‘ঘুম হারাম’ হওয়ার মতো চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল তিস্তা নদী সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে স্বীকার করেছেন যে, তিস্তা ইস্যু নিয়ে ভারতের সামগ্রিক নীতি নির্ধারণে নয়াদিল্লি সাম্প্রতিক সমস্ত পরিস্থিতি ও নতুন অগ্রগতিকে (চীনের প্রবেশ) বিবেচনায় রাখবে। তিনি জানিয়েছে, তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে ভারতের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়া এবং যৌথ রোডম্যাপের দোহাই দিয়ে ঢাকার ওপর চাপ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হলেও, ভারতের আসল মাথাব্যথার মূল কারণ হচ্ছে তিস্তা প্রকল্পে চীনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং ভারতের এতদঞ্চলের একাধিপত্য খর্ব হওয়া।
সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের তীব্র উদ্বেগের নেপথ্যে মূলত তিনটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে।
শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা ঝুঁকি: তিস্তা নদীটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সমান্তরালে প্রবাহিত। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের অবস্থান সীমান্ত থেকে মাত্র ১০-২০ কিলোমিটার দূরে, যা ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘শিলিগুড়ি করিডর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর একেবারে কাছে। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আটটি রাজ্যের যোগাযোগের একমাত্র সংকীর্ণ পথটির কাছে চীনা প্রকৌশলী ও প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি দিল্লির জন্য বড় ভূরাজনৈতিক ও সামরিক হুমকি হিসেবে দেখছে দিল্লির নীতি নির্ধারকরা।
সামরিক ও কৌশলগত সংশয়: ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এই প্রকল্পে যুক্ত মূল প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ারচায়না’ সরাসরি চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) কৌশলগত কাজের সাথে সম্পৃক্ত। ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, তিস্তার নদী খনন ও পরিকাঠামো উন্নয়নের আড়ালে বেইজিং ভারতের ঘরের কাছে নিজের স্থায়ী ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বদল: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে মাইনাস করে চীনকে বেছে নিয়েছেন, যা সাধারণত দিল্লির জন্য সংরক্ষিত থাকে বলে দাদাগিরি করা ভারত মনে করত। এছাড়া, মোংলা বন্দরের কাছে পূর্বে ভারতের জন্য নির্ধারিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটির চুক্তি বাতিল করে চীনা রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বেইজিংয়ের প্রস্তাবিত ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ’ অর্থনৈতিক করিডোর এবং পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল সচিবালয়ের সাবেক পরিচালক তারা কার্থা ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “তিস্তা প্রকল্পটির সরাসরি নিরাপত্তা প্রভাব রয়েছে ভারতের ওপর। এই প্রকল্পে যুক্ত চীনা প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ারচায়না’ সরাসরি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও পিপলস লিবারেশন আর্মির কৌশলগত কাজের সঙ্গে যুক্ত।”
বাংলাদেশের এই স্বাধীন ও সার্বভৌম অর্থনৈতিক মেরুকরণ আধিপত্যবাদী ভারতকে আরও বেশি শঙ্কিত করে তুলেছে। ভারতীয় গণমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’র এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের ‘সিপেক’ প্রকল্পের পর বেইজিং এখন ভারতের পূর্ব সীমান্তে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে যুক্ত করে একটি ত্রিমুখী অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেইজিং এই ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ’ বহুমুখী বাণিজ্য পথের প্রস্তাব দিয়েছে, যা ভারতকে পুরোপুরি বাদ দিয়েই বঙ্গোপসাগরে চীনের সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে।
শুধু তাই নয়, ভারতের আগ্রাসী নীতির মুখে বড় ধাক্কা দিয়ে মোংলা বন্দরের কাছে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য ২০১৫ সালের ভারত-সমর্থিত একটি উদ্যোগকে বাতিল করে সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে ঢাকা। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি ‘২+২ সংলাপ’ শুরুর বিষয়েও নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
একই সাথে ভারতের জন্য বাড়তি অস্বস্তি ও আতঙ্ক তৈরি করেছে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাড়তে থাকা কৌশলগত যোগাযোগ। সম্প্রতি পাকিস্তান থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের বাণিজ্য প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করেছে এবং রাওয়ালপিন্ডি বাংলাদেশের কাছে যৌথ সামরিক কমান্ডের প্রস্তাবসহ ‘জেএফ-১৭ ব্লক ৩’ ফাইটার জেট সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে, যার সিমুলেটর ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
ভারতের প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং সব ধরনের কূটনৈতিক চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থে সম্পূর্ণ অনড় ও আপসহীন অবস্থান ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি বেইজিং সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনাকে বাংলাদেশের একটি “জাতীয় অগ্রাধিকার” হিসেবে ঘোষণা করেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই মহাপরিকল্পনা “যেকোনো মূল্যে” বাস্তবায়ন করা হবে। কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না বাংলাদেশ।
গত ২৯ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসনে জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। সংসদে প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, “রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে সরকার বদ্ধপরিকর। বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের পাশাপাশি তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করবে। পানিসম্পদের স্থায়ী সমাধানে সরকার কোনো বিদেশি বা ভূরাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।”
তিস্তা নিয়ে ভারতের বর্তমান গাত্রদাহ ও উদ্বেগকে তীব্র সমালোচনা করে খোদ ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতের এই পরিস্থিতির জন্য তাদের নিজেদের ‘দীর্ঘদিনের ছলচাতুরী, বিলম্ব ও অবহেলা’ দায়ী। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে, যার মধ্যে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ২০১১ সাল থেকে ঝুলিয়ে রেখেছে দিল্লি। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার সস্তা অজুহাতে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে নয়াদিল্লি ঢাকাকে ন্যায্য হিস্যা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে আসছে।
শুকনো মৌসুমে উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের মাধ্যমে একতরফা ও গায়ের জোরে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চরম খরা, মরুকরণ ও পানি সংকটের মুখোমুখি হয়। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি মরুভূমিতে পরিণত হয়। আবার বর্ষাকালে ভারত কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙন সৃষ্টি করে।
ভারত যখন আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে তিস্তাকে একতরফা নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন বাংলাদেশ এই খরা ও বন্যার বৈপরীত্য থেকে বাঁচতে নিজস্ব সার্বভৌম ক্ষমতাবলে নদী খনন, তীর সংরক্ষণ এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ফলে ভারতের এই ‘দাদাগিরি’ ও অন্যায্য আপত্তিকে কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না বাংলাদেশের জনগণ। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তঃসীমান্ত জলপ্রবাহ বিষয়ক কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক আইনের ‘ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার’ নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভারত দীর্ঘদিন যে আধিপত্যবাদী আচরণ করেছে, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তার উপযুক্ত জবাব দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়তার সাথে বলছেন, বাংলাদেশের জন্য তিস্তা কেবল কোনো প্রকৌশল বা পরিকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের ভূখণ্ডের ভেতরে নদী ব্যবস্থাপনার জন্য যেকোনো বন্ধুদেশের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে।
ভারত যদি নিজেরা চুক্তি না করে ছলচাতুরী করে এবং বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন উদ্যোগেও বাধা সৃষ্টি করতে চায়, তবে তা কোনো সুসভ্য কূটনীতি হতে পারে না। তিস্তাকে ভূরাজনীতির দাবার ঘটি না বানিয়ে ভারতের উচিত অবিলম্বে ঢাকাকে ন্যায্য পানির নিশ্চয়তা দেওয়া, অন্যথায় এই অঞ্চলে দিল্লির একাধিপত্য ও আগ্রাসী মোড়লগিরি চিরতরে ধূলিসাৎ হতে বাধ্য বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আপনার মতামত লিখুন :