

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগমনকে ঘিরে আজ উৎসবের আবহ কিশোরগঞ্জজুড়ে। কিশোরগঞ্জ সদর, পাকুন্দিয়া ও কটিয়াদীর জনপদে প্রস্তুত বরণঢালা; সড়কজুড়ে সাজসজ্জা আর জোরদার নিরাপত্তার বলয়ের মধ্যেও মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। তাকে বরণ করে নিতে প্রশাসনের ব্যস্ততা আর দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের কর্মচাঞ্চল্যে তিন জনপদজুড়ে তৈরি হয়েছে এক অন্যরকম আবহ।
প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে সকল আয়োজন শেষ হয়েছে; পাশাপাশি নিরাপত্তার বলয়ও জোরদার করা হয়েছে। আর সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে তকে একনজর দেখার, কাছ থেকে শোনার আকাক্সক্ষা। কিন্তু এই অপেক্ষা কেবল একজন সরকারপ্রধানকে দেখার আবেগ নয়; তবে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে দীর্ঘদিনের নাগরিক সংকটের সমাধান ও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন নিয়ে প্রত্যাশাও বেড়েছে স্থানীয়দের। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে কিশোরগঞ্জের মানুষের অপেক্ষা যেন শুধু একটি দিনের জন্য নয়; এটি তাদের বহুদিনের প্রত্যাশার দরজায় নতুন আশার কড়া নাড়ার মুহূর্ত।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে পাকুন্দিয়ায় উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরাও নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সম্পন্ন হয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সড়ক সংস্কার, সাজসজ্জা ও নিরাপত্তা জোরদারের কাজ। বিভিন্ন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও পাড়া-মহল্লায় নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা। সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে দেয়া হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের দাওয়াত।
সফরের প্রস্তুতি দেখতে ইতোমধ্যে পাকুন্দিয়া পরিদর্শন করেছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মো. আমিন উর রশিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম। তাদের সঙ্গে ছিলেন কিশোরগঞ্জ-২ (পাকুন্দিয়া-কটিয়াদী) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দীন, জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুপম দাস, পাকুন্দিয়া থানার ওসি এস এম আরিফুর রহমানসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তাঁরা সফরসূচির আওতাধীন বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখে প্রস্তুতির খোঁজ খবর নেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, আজ সকাল সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর পাকুন্দিয়ায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উপলক্ষে মির্জাপুর চেয়ারম্যানবাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিতরণ করবেন তিনি। পরে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সুধীজনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা রয়েছে।
পাকুন্দিয়া পৌর বিএনপির সভাপতি এস এ এম মিনহাজ উদ্দীন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। তাকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন কর্মসূচির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। একই কথা জানিয়েছেন পাকুন্দিয়া উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ভিপি কামাল উদ্দিন।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দীন বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করছেন। এ বিষয়টি মাথায় রেখে তাকে স্বাগত জানাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীকে দেখার আগ্রহের পাশাপাশি কটিয়াদীবাসীর মনে রয়েছে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশা। তাদের দাবির তালিকায় রয়েছে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা, কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া-ইটাখোলা আঞ্চলিক সড়ক স্থায়ীভাবে সংস্কার ও প্রশস্তকরণ, কালিয়াচাপড়া চিনিকল পুনরায় চালু, গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন। একই সঙ্গে মৎস্য খাতকে আধুনিক ও বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলার দাবিও রয়েছে।
বিশেষ করে ইটাখোলা-মঠখোলা-কটিয়াদী আঞ্চলিক মহাসড়কের দুর্ভোগ নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে সড়কটির বিভিন্ন অংশে সংস্কারকাজ শুরু হলেও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সাময়িক জোড়াতালি নয়; প্রয়োজন টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।
হাওর, বিল, নদী ও জলাশয়সমৃদ্ধ কটিয়াদীতে মৎস্য উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। জাতীয় মৎস্য দিবসের কেন্দ্রীয় আয়োজন কটিয়াদীতে হওয়ায় এ খাতের সম্ভাবনা জাতীয় পর্যায়ে আরও গুরুত্ব পাবে বলে আশা করছেন তারা।
কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক সড়কের বেহাল দশা, জেলার বিভিন্ন সড়কে খানাখন্দ, ঢাকার সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং শহরের বুক চিরে প্রবাহিত নরসুন্দা নদীর দখল-দূষণও মানুষের উদ্বেগের বড় কারণ। হাওরের রাতাবোরো চাল ও অষ্টগ্রামের পনিরের মতো সম্ভাবনাময় পণ্য, মৎস্য ও হাওর পর্যটনকে ঘিরেও আরও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ চান জেলার মানুষ।
কিশোরগঞ্জকে সুশিক্ষার নগরী হিসেবে গড়ে তোলার দাবিও জোরালো। কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঈশাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়ে তুলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী আজিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়, ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজ, আরজত আতরজান উচ্চবিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয়করণের জাতীয়করণের দাবিও দীর্ঘদিনের। নরসুন্দায় প্রাণ ফেরানো, শহরের যানজট নিরসন, সরকারি হাসপাতালগুলোকে মানুষের আস্থার ঠিকানা হিসেবে গড়ে তোলা এবং শিক্ষাঙ্গনকে আরও কার্যকর করার প্রত্যাশাও রয়েছে জেলার মানুষের।
কিশোরগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি কিশোরগঞ্জ-ঢাকা রেলপথে ডাবল লাইন চালুসহ একটি বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা। তাদের কাছে এটি শুধু একটি নতুন ট্রেনের দাবি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি, স্বপ্ন ও উন্নত যোগাযোগের আকাক্সক্ষা।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভালোবাসা ও আবেগের নিদর্শন হিসেবে তাই ট্রেনটির নাম ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ করার প্রস্তাবও উঠেছে। শোলাকিয়ার ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রতিদিন রাজধানীর পথে ছুটবে একটি ট্রেন-যার সঙ্গে বয়ে যাবে কিশোরগঞ্জবাসীর যোগাযোগ, উন্নয়ন ও সম্ভাবনার নতুন স্বপ্ন।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে কিশোরগঞ্জ, পাকুন্দিয়া ও কটিয়াদীতে আজ সাজসাজ রব। মাঠের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে, আর মানুষের মনে জমেছে প্রত্যাশার নানা রং। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আজকের এ সফর তাই স্থানীয়দের কাছে নিছক একটি সরকারি কর্মসূচি নয়; দীর্ঘদিনের দাবি, বঞ্চনা ও সম্ভাবনার কথা সরকার প্রধানের সামনে তুলে ধরারও একটি বড় সুযোগ। তাদের প্রত্যাশা; এই সফর উন্নয়নের নতুন দরজা খুলবে এবং বদলে দেবে কিশোরগঞ্জের দীর্ঘদিনের অবহেলা; বঞ্চনা ও অপেক্ষার গল্প।
আপনার মতামত লিখুন :