বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার সমীকরণে বদলের সম্ভাবনা বড় পরীক্ষা্র মুখে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১০:১৭ অপরাহ্ণ / ০ Views
বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার সমীকরণে বদলের সম্ভাবনা বড় পরীক্ষা্র মুখে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু

এআই নির্মিত প্রতীকী ছবি

বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির সংঘাতের মধ্যে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফিরেছেন। সার্বিয়ায় দীর্ঘদিনের নেতা আলেক্সান্দার ভুচিচের পরাজয় ঘটেছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কাছে। এবার নজর ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণে এই চার নির্বাচনকে বিশ্বরাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। বিশ্লেষণটির মূল প্রশ্ন ছিল- বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী ডানপন্থীদের অগ্রযাত্রা আরও শক্তিশালী হবে, নাকি গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে? ব্রাজিল ও সার্বিয়ার ফলাফলে ইতোমধ্যে সেই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর পাওয়া গেছে।

সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বে একজন সাধারণ নাগরিকের ভোগ করা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মাত্রা ১৯৭৮ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এই পরিস্থিতিতে চার দেশের নির্বাচনকে শুধু সরকার গঠনের প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ৮০ বছর বয়সী বামপন্থী নেতা লুলা দা সিলভা। প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার পর লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিওর ভোট ৪৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয় দফায় এই জয় লুলার রাজনৈতিক জীবনে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই ফল ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও রাজনৈতিক ধাক্কা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্রাজিলে ফ্লাভিওর গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিত্র ছিলেন। ফ্লাভিওর বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করার অভিযোগে ২৭ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। ফ্লাভিও নির্বাচনে জয়ী হলে বাবাকে ক্ষমা করার এবং সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

লুলার জয়কে ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প ভোটের ফল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে ফ্লাভিও প্রথমে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নির্বাচন বাতিলের দাবি তোলার কথা বলেছেন; পরে তার দল ফলাফল স্বীকার করেছে।

সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কাছে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা আলেক্সান্দার ভুচিচ। প্রায় দুই বছর ধরে চলা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের পর এই ফল দেশটির রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে।

২০২৪ সালে নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর আন্দোলন শুরু হয়। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা পরে নির্বাচনে অংশ নিতে শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রার্থী তালিকা গঠন করেন।

প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীরা প্রায় ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টের ২৫০ আসনের মধ্যে প্রায় ১৪০টি আসন অর্জন করেছেন। ভুচিচের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে প্রায় ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। ভুচিচ নিজেও পরাজয় স্বীকার করেছেন।

এই বিজয়কে দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে নাগরিক আন্দোলনের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নির্বাচনে জয়ের পর আন্দোলনকারীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর অভাব রয়েছে। দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের পর এটিই দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন। গাজায় যুদ্ধ, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি- সব মিলিয়ে এবারের ভোট বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির। তবে বিরোধীদের মধ্যে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও ফিলিস্তিন প্রশ্ন ও নিরাপত্তানীতি নিয়ে তাদের অবস্থান পুরোপুরি এক নয়।

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনও একটি দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না করলে সরকার গঠনের জন্য জোট করতে হয়। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনে প্রয়োজন ৬১টি আসন। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুবিরোধী শিবির এগিয়ে থাকলেও তাদের পক্ষে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। আরব দলগুলোর সমর্থনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নির্বাচনের ফল যাই হোক, ইসরায়েলের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে কি না, তা নির্ভর করবে নতুন সরকার গঠনের সমীকরণের ওপর। নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালেও ফিলিস্তিনিদের অধিকার, গাজার ভবিষ্যৎ ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান নিয়ে বিরোধী শিবিরের অবস্থান কতটা বদলাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এই নির্বাচন তার নীতির প্রতি জনসমর্থন এবং রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

সাম্প্রতিক জরিপ ও নির্বাচনী পূর্বাভাসে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষে ভিন্ন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আইনপ্রণেতাদের সংঘাত বাড়তে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত, সরকারি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং বাজেট বরাদ্দের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবেন। এর ফলে অভিবাসন, শুল্কনীতি ও নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে ট্রাম্পের প্রশাসনকে আরও বেশি জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে।

তবে কংগ্রেসের একটি কক্ষে জয় পেলেই ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের নীতি থামিয়ে দিতে পারবেন না। প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে, আর গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস ও ভেটো অকার্যকর করতে কংগ্রেসে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়ালেও রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চার নির্বাচনের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। ব্রাজিলে লুলার জয় এবং সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের বিজয় দেখিয়েছে, ক্ষমতাসীন বা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার নেতাদের পরাজিত করা সম্ভব। তবে ইসরায়েলে সরকার গঠনের সমীকরণ এখনও অনিশ্চিত, আর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল জানা যাবে আগামী ৩ নভেম্বরের পর।

এই নির্বাচনের তাৎপর্য শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ক্ষমতার পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়। ব্রাজিলে পরিবেশনীতি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সার্বিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার, ইসরায়েলে নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিননীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ- প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফলাফলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার যে প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তা থামাতে শুধু নির্বাচনে জয় যথেষ্ট নয়। নির্বাচিত সরকারগুলোকে আইনের শাসন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। ব্রাজিল ও সার্বিয়ার ফল পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে; এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভোট নির্ধারণ করবে এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, আল-জাজিরা