

একদিন যে নগরীর সকাল শুরু হতো কলকারখানার সাইরেনে, শ্রমিকের পদচারণায় আর শিল্পাঞ্চলের কর্মচাঞ্চল্যে; আজ সেই খুলনার অনেক শিল্পচত্বরেই নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। কোথাও বন্ধ কারখানার মরচে ধরা ফটক, কোথাও পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি, আবার কোথাও জীবিকার তাগিদে পেশা বদলে ফেলা মানুষের দীর্ঘশ্বাস। অথচ এই শহরের বুকেই এখনো বেঁচে আছে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অমিত সম্ভাবনা। মোংলা বন্দরের বিস্তৃত অর্থনৈতিক বলয়, পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক যোগাযোগের নতুন বাস্তবতা, তরুণ জনগোষ্ঠী, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের হাতছানি খুলনাকে দিতে পারে নতুন অর্থনৈতিক পরিচয়।
একদিকে শিল্পের পতন, বেকারত্ব, পানিবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন ও গণপরিবহনের সংকট। অন্যদিকে বিনিয়োগ, শিল্প পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান, বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও আধুনিক নগর হয়ে ওঠা—সংকট আর সম্ভাবনার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে খুলনা।
খুলনার ইতিহাস কেবল একটি জনপদের নগর হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে একটি শহরের জন্ম, বিকাশ ও পরিবর্তনের ইতিহাস। একসময় পাট, নিউজপ্রিন্ট, কাগজ, টেক্সটাইল, দেশলাইসহ নানা শিল্পের জন্য খুলনার পরিচিতি ছিল দেশজুড়ে। ভৌগোলিক অবস্থান, নদীপথের যোগাযোগ, মোংলা বন্দরের নৈকট্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ এ অঞ্চলে শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিশেষ করে খালিশপুর, দৌলতপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল একসময় ছিল কর্মচাঞ্চল্যের প্রতীক। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে গড়ে ওঠা বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল শ্রমিক আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার, সড়ক ও নাগরিক সুবিধা। একসময় এসব মিলে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ছিল আরো অনেক বেশি। খালিশপুর হাউজিং এস্টেট তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
অর্থাৎ, খুলনার নগরায়ণ কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধির স্বাভাবিক পরিণতি ছিল না; শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এর জনপদের কাঠামো। কিন্তু সময়ের পালাবদলে সেই চিত্র বদলে গেছে। একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। উৎপাদন কমেছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে, দুর্বল হয়েছে বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের আয়ের ভিত্তি। ২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শিল্পনগরী খুলনার অর্থনৈতিক সংকট আরো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। শিল্পের এই পতন শুধু কয়েকটি কারখানার দরজায় তালা পড়ার ঘটনা নয়। এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে পুরো নগরজীবনে। শ্রমিকের আয় কমেছে, ক্ষুদ্র ব্যবসার বাজার সংকুচিত হয়েছে, শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক আবাসিক এলাকাগুলোতে অর্থনৈতিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক তরুণ কাজের সন্ধানে বাড়ি ছাড়ছেন।
শিল্পের চাকা থেমে গেলেও থামেনি মানুষের জীবন। নতুন কাজের সন্ধানে কেউ ফুটপাতে পণ্য বিক্রি করছেন, কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ ছোট দোকান খুলেছেন। কেউ ঘরে বসে ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরিচালনা করছেন, আবার কেউ দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। একসময় শিল্পকারখানায় কাজ করা মানুষের একটি অংশও এখন জীবিকার প্রয়োজনে পেশা পরিবর্তন করেছেন।
খুলনার সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক অভিঘাত। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদগুলোতে জীবিকার অনিশ্চয়তা আরো প্রকট হয়ে ওঠে। লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবন-জীবিকাকে দুর্বল করেছে। বিশেষ করে কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, বাগেরহাটের শরণখোলা মোংলা ও আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের একটি অংশ জীবিকার বিকল্প খুঁজতে খুলনা শহরমুখী হয়েছেন। কেউ এসেছেন কাজের সন্ধানে, কেউ সন্তানদের পড়াশোনা কিংবা নিরাপদ বসতির আশায়। এতে শহরের ওপর বাড়ছে আবাসন, পানি, পয়োনিষ্কাশন, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবহনব্যবস্থার চাপ। অপরিকল্পিতভাবে শহরতলি বিস্তৃত হচ্ছে। কৃষিজমি, নিচু জমি ও জলাশয় ভরাট করে তৈরি হচ্ছে নতুন বসতি ও স্থাপনা। এর ফলে শহর আয়তনে বাড়ছে, অথচ অর্থনীতির পুরোনো ভিত সংকুচিত হচ্ছে। ফলে প্রায় ১৮ লাখ মানুষের শহর হিসেবে পরিচিত খুলনায় গণপরিবহন সংকট এখন নগরজীবনের অন্যতম বড় দুর্ভোগ। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী, প্রবীণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহজলভ্য, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
বৃহত্ত্বর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্নয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফুজ্জামান বলেন, এত সংকটের মধ্যেও খুলনার সামনে সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় দুয়ারগুলোর একটি মোংলা বন্দর। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ হিসেবে এই বন্দরের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ফলে মোংলা বন্দরকে ঘিরে আমদানি-রফতানি, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লজিস্টিকস খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু বন্দরের সক্ষমতা বাড়লেই খুলনার অর্থনীতি বদলে যাবে না। প্রয়োজন বন্দর, শিল্প, কৃষি, মৎস্য, পরিবহন ও বিপণনব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সংযোগ।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য, মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে দেশি-বিদেশি বাজারে পৌঁছে দেওয়ার বিশাল সুযোগ রয়েছে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, হিমাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, রফতানিমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং পরিবহনসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে খুলনা আবারও উৎপাদন ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে অব্যবহৃত শিল্পাঞ্চলগুলোকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। পুরোনো শিল্পজমিতে আধুনিক কারখানা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের শিল্পকেন্দ্র, কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং সহায়ক বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনার সভাপতি প্রফেসর রমা রহমান বলেন, খুলনার আরেকটি বড় সম্পদ এর তরুণ জনগোষ্ঠী। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে এখানে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শিক্ষিত তরুণদের সামনে বড় প্রশ্ন-পড়াশোনা শেষে কাজ কোথায়? স্থানীয়ভাবে মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেকেই রাজধানী কিংবা দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে চলে যাচ্ছেন।
কৃষিবিদ এসএম নজরুল ইসলাম বলেন, কৃষিজমি শুধু ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, এটি খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং শহরের সঙ্গে গ্রামের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একইভাবে খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধার শহরের পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য।
নাগরিক নেতা ও পরিবেশকর্মী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার সামনে এখন দুটি বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একদিকে শিল্পের পতন, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গণপরিবহন ও আবাসন সংকট। অন্যদিকে মোংলা বন্দর, আঞ্চলিক যোগাযোগ, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ, তরুণ জনগোষ্ঠী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নতুন বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারলেই খুলনার অর্থনৈতিক ও নগরজীবনে নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন এমন একটি উন্নয়ন দর্শন, যেখানে শিল্পায়ন হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হাতিয়ার, নগর পরিকল্পনা হবে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যম, পরিবেশ সংরক্ষণ হবে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ভিত্তি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছাবে সমাজের সব স্তরে।
শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), খুলনা সিটি করপোরেশন, জাতীয় উন্নয়ন সংস্থা এবং আশপাশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। প্রয়োজন একটি সমন্বিত মহানগর ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যেখানে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট থাকবে। পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়সীমা, অর্থায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
আপনার মতামত লিখুন :