বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আলোচিত নতুন ৪ মুখঃ ২০ আগস্টের পর দল ও সরকারে পরিবর্তন আসছে


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : আগস্ট ১৬, ২০২৬, ৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ /
বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আলোচিত নতুন ৪ মুখঃ ২০ আগস্টের পর দল ও সরকারে পরিবর্তন আসছে

বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৮০ দিনের টার্গেট দিয়েছিলেন মন্ত্রিপরিষদের সকল সদস্যকে। সেই সময়সীমা শেষ হতে চলেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর মূল্যায়নে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসছে বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলের মহাসচিবকে প্রার্থী ঘোষণা। এতে দলের ভেতরেও গুরুত্বপূর্ণ পদেও পরিবর্তন নিশ্চিত। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একই সঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, মহাসচিব এবং সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী। তাই আগামী কয়েকদিনের মধ্যে দলে এবং সরকারে বেশকিছু পরিবর্তন আসছে।

পরিবর্তন পক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার স্থায়ী কমিটিতে নতুন ৪ জনকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন- দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ডোনার ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। ২০ আগস্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দলে নতুন মহাসচিবের নাম ঘোষণা করা হবে এবং মন্ত্রীসভায় রদবদল ও পরিবর্তনও হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

এর বাইরে অঙ্গসংগঠনগুলোতেও চলতে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া। গত বৃহস্পতিবারই ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান এবং ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান। দু’এক দিনের মধ্যেই এই সংগঠনটি নতুন নেতৃত্ব পাচ্ছে। এছাড়া খুব দ্রুতই জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অন্যান্য সংগঠনেও পরিবর্তন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক শীর্ষ নেতা।

স্থায়ী কমিটিতে নতুন ৪ মুখ : বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নতুন করে চার নেতাকে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, প্রফেসর ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই চার নেতাকে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।

নতুন সদস্যদের মধ্যে রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রদলের রাজনীতির দিয়ে তার উত্থান। সংগঠনটির প্রথম নির্বাচিত সভাপতিও ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি, বিএনপির দপ্তর সম্পাদক হয়ে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। ১/১১’র চরম সঙ্কটময় মুহূর্তে এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই-সংগ্রামে রুহুল কবির রিজভী অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছেন বিএনপিতে। আমান উল্লাহ আমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) ভিপি, ছাত্রদলের সভাপতি, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, ভাইস-চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।

প্রফেসর ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার দেশের প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এর সভাপতি, বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। এছাড়া পেশাজীবী বিভিন্ন সংগঠনে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বিগত বছরগুলোতে তিনি বিএনপির মিডিয়া সেল, নির্বাচন পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণী কমিটিতে দায়িত্ব পালন এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। ওই কাউন্সিলের পর জাতীয় স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। পরে সদস্যদের মৃত্যু ও পদত্যাগসহ বিভিন্ন কারণে কমিটির কয়েকটি পদ শূন্য হয়। বিভিন্ন সময়ে এসব পদে নতুন সদস্য যুক্ত করেছে দলটি। এবার একসঙ্গে চারজনকে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত করা হলো।

১৯ সদস্য বিশিষ্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আগে থেকে ১৩ জন রয়েছেন । তারা হলেন- তারেক রহমান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে। তাঁর প্রার্থীতা ঘোষণার পর গত বৃহস্পতিবার দলীয় পদ ছেড়ে দিয়েছেন। গতকাল নতুন চার সদস্য যুক্ত হওয়ায় এখন স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে।

কে হচ্ছেন নতুন মহাসচিব : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেয়ায় তিনি স্থায়ী কমিটির এবং বিএনপি মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এর মাধ্যমে দলটির গুরুত্বপূর্ণ এই পদ এখন শূণ্য হয়েছে। ফলে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা কে হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন দলের বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব (স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য) রুহুল কবির রিজভীর নাম। তিনি দলের সবচেয়ে দুঃসময়ে দলকে রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জীবনবাজী রেখে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রেখেছেন। এজন্য তাকেই এই পদে সম্ভাব্য যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করছেন দলের নেতাকর্মীরা। যদিও তিনি ছাড়াও এই পদের জন্য একাধিক নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা মধ্যে অন্যতম- স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন আহমদ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল ও শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী।

বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, যেহেতু মহাসচিব পদত্যাগ করে চলে গেছেন এবং এই মুহূর্তে দলের কোনো কাউন্সিল হচ্ছে না, তাই একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তার (সাবেক মহাসচিবের) পরে সিনিয়রিটির ভিত্তিতে যিনি আছেন অথবা অন্য কোনো নেতা, অর্থাৎ একজন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পাবেন। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর।

দলীয় গঠনতন্ত্রের নিয়ম উল্লেখ করে শামসুজ্জামান দুদু বলেন, আমাদের দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণত পার্টির চেয়ারম্যানই মহাসচিব মনোনীত করেন। পরবর্তীতে সেটি কাউন্সিলে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু যেহেতু এখন কাউন্সিল হচ্ছে না, সেই হিসেবে চেয়ারম্যান যাকে মনোনীত করবেন, তিনিই আগামী কাউন্সিল হওয়া পর্যন্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কোন কারণে মহাসচিব পদ শূণ্য হলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে ২০ মার্চ তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান।

বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, বর্তমান মহাসচিব প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলে মহাসচিব পদে নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতেই হবে। সেক্ষেত্রে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন। আবার দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, চেয়ারম্যান চাইলে এই পদে যে কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন এবং তিনি পরবর্তীতে স্থায়ী কমিটির সভায় সেটি অনুমোদন করে নিবেন।
মির্জা ফখরুল মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করার পর কে বসতে যাচ্ছেন এই পদে সেটি নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী সোহেলের নাম আলোচনা হচ্ছে।
দলটির স্থায়ী কমিটি ও একাধিক সূত্র জানায়, মহাসচিব পদেও কাকে বসানো হবে সেই সিদ্ধান্ত নিবেন তারেক রহমান। তবে বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান, দলের প্রতি ডেডিকেশন, জিয়া পরিবারের প্রতি আন্তরিকতা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগসহ সার্বিক দিক বিবেচনা করে দায়িত্ব দেয়া হবে।

রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন করেননি, তাঁকে মন্ত্রিসভায়ও রাখা হয়নি। তাই মহাসচিবের পদ শূন্য হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন দায়িত্বশীল নেতাদের কেউ কেউ। রিজভী দলের দুর্দিনে রাজপথে লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। যখন রাজপথে নামতে অনেকের বুক কাপতো তখন তিনি প্রতিবাদ-মিছিল করেছেন, একাধিকবার গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের গ্রেফতার-হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে দীর্ঘদিন একাই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রেখেছেন।

মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের ১৮০ দিনের টার্গেট দিয়েছিলেন এবং নির্ধারিত সময় পরে তা মূল্যায়ণের কথা জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে মন্ত্রিদের আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুলকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেয়ায় তার জায়গায় শূণ্যতা সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারের ভেতরে বাইরে জোর গুঞ্জন চলছে মন্ত্রিদের ১৮০ দিনের মূল্যায়নে কারো কারো কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রী খুশি হলেও অনেকের বিষয়ে অসন্তুষ্ট। ফলে বেশ কয়েকজন মন্ত্রির মন্ত্রণালয় রদবদল, কয়েকজনকে বাদ দিয়ে নতুন কয়েকজনকে অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

এর মধ্যে- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এবং তার সাথে একজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রকিবুল ইসলাম বকুল, গিয়াসউদ্দীন রিমনের নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, বেগম সেলিমা রহমান, কেন্দ্রীয় নেতা জয়নুল আবদীন ফারুক, এবিএম মোশাররফ হোসেন, শরিক দলের মধ্যে বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থসহ একাধিক ব্যক্তির নাম আলোচনায় রয়েছে। যদিও এই বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর উপরই নির্ভর করছে।