

ছবি: সংগৃহীত
দিল্লিকে নিরাপত্তার দুর্গে পরিণত করেও আন্দোলন থামাতে পারল না ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় ৪০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, হাজারো মানুষকে আটক এবং মেট্রো-রেল চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের পরও রাজপথে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। ফলে গোটা ভারতজুড়ে রাজনৈতিক সংঘাতের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে, প্রায় ২৪ ঘণ্টা আটক থাকার পর রোববার মুক্তি পেয়েছেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দুই সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। তাদের ঘোষণা, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে, ছড়িয়ে দেওয়া হবে সারা দেশে।
অন্যদিকে বিক্ষোভ ঘিরে গণআটক ও জনজীবনে বিধিনিষেধের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি প্রশাসনের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। নির্বিচার আটক বন্ধ, মানুষের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত এবং মেট্রো, রেল ও ইন্টারনেট পরিষেবা সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ফলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে আন্দোলন: সিজেপির আন্দোলনের সূত্রপাত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে দলটি। তবে নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
শনিবার যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচির অনুমতি না দেওয়ার পর দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড, পুলিশি বাধা ও ধরপাকড় শুরু হয়। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে প্রায় ৪০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আটক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীর একাধিক স্থানে যান চলাচল ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়।
বিমান থেকে আটক, মুক্তির পর অনড় নেতারা: শনিবার মুম্বাই থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ দিল্লিতে অবতরণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়। সিজেপির নেতাদের অভিযোগ, পুলিশ জোর করে উড়োজাহাজে ঢুকে তাঁদের আটক করে এবং আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়নি। তাদের মোবাইল ফোন জব্দ করা হলেও কোনো জব্দতালিকার কপি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সৌরভ দাস। ফোনে তথ্য পরিবর্তন বা ভুয়া প্রমাণ যুক্ত করার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তারা। এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
রোববার সকালে দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত এক বছর শান্তিভঙ্গ না করার শর্তে তিন নেতাকে মুক্তি দেন বলে জানিয়েছেন সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং।
তবে আন্দোলন না করার কোনো মুচলেকায় স্বাক্ষর করেননি বলে জানিয়েছেন অভিজিৎ দীপকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, তাঁরা আবারও রাজপথে নামবেন। দাদির শেষকৃত্যে যোগ দিতে তিনি মহারাষ্ট্রের নিজ শহরের উদ্দেশে রওনা হন।
রোববার সংবাদ সম্মেলনে সৌরভ দাস অভিযোগ করেন, দেশে জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং রাষ্ট্র নাগরিকদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। আশুতোষ রাঙ্কার ঘোষণা, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহেরও সমালোচনা করেন তারা। সিজেপি নেতারা যন্তর মন্তর এলাকায় বিক্ষোভকারীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রশাসনের ওপর চাপ: রোববার বিশেষ শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট বলেন, আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক করা যাবে না। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় নিষেধাজ্ঞা নেই—এমন এলাকায় শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র সমাবেশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বেআইনিভাবে আটক করা যাবে না।
আদালত আরও নির্দেশ দেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ছাড়া মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং ইন্টারনেট সংযোগ নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। বিক্ষোভকারীদের চলাচলে বাধা দিতে বসানো ব্যারিকেডের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
শনিবার দিল্লিতে ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং প্রায় ২৫০টি ট্রেন বাতিলের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আগের আদেশে ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রসঙ্গও ছিল। রোববার কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানায়, মেট্রো ও রেল চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হলফনামা ও সম্মতিপ্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী শুনানি ১৩ অক্টোবর।
আদালত সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন। পুলিশ সদস্যদের পরিচয়চিহ্ন না পরাসহ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের জবাব চাওয়া হয়েছে।
দিল্লির বাইরে প্রতিবাদ, পাল্টা আক্রমণে বিজেপি: আন্দোলনের আঁচ দিল্লির বাইরেও ছড়িয়েছে। মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় অভিনেতা ইমরান খানসহ কয়েকজনকে আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। বেঙ্গালুরুতেও প্রতিবাদ হয়েছে। দিল্লিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকারের মতো বিরোধী নেতাদের আটক করার ঘটনায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল কেন্দ্রের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তরুণদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাঁদের পাশে থাকার কথা বলেছেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও কেন্দ্রের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নেহা বোরা এবং স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার নেত্রী আয়েশা ঘোষও আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো আটক ব্যক্তিদের নির্যাতন, অমানবিক পরিবেশে আটকে রাখা এবং অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সিজেপিকে বিরোধীদের একটি শাখা আখ্যা দিয়ে বিজেপির প্রধান নিতিন নবীন অভিযোগ করেছেন, বিদেশি শক্তির ইন্ধনে দলটি ভারতের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত সিজেপিকে কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির ‘বি-টিম’ বলেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রয়েছে, তবে নৈরাজ্য ছড়ানোর অধিকার কারও নেই।
রাজনৈতিক সংঘাতের শঙ্কা: ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার এবং প্রশাসনের জবাবদিহি—সব প্রশ্ন এখন একই সঙ্গে সামনে এসেছে। তিন নেতার মুক্তি আন্দোলনের তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমালেও বিরোধের অবসান ঘটায়নি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কতটা কার্যকর হয় এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির ঘোষিত দেশব্যাপী আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ।
আপনার মতামত লিখুন :