দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এ যেন অসহায় ট্রাম্পের আত্মসমর্পণ!


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : এপ্রিল ৯, ২০২৬, ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ /
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এ যেন অসহায় ট্রাম্পের আত্মসমর্পণ!

ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম দেখায় এটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য মনে হলেও ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। চুক্তির শর্ত, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এবং বিশ্বমঞ্চে মার্কিন ভাবমর্যাদার অবনতির হিসাব মেলালে স্পষ্ট হয়ে যায়, এই যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বুধবার রাত ৮টার মধ্যে চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সেই নির্ধারিত সময়সীমার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে তিনি নিজেই পিছু হটে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। চরম হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত এভাবেই পিছিয়ে আসার দৃশ্য বিশ্বের সামনে মার্কিন অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হরমুজ প্রণালি নিয়ে। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ইরান প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দিতে রাজি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে তারা জানিয়ে দিয়েছে, এই জলপথে তাদের ‘কর্তৃত্ব’ এখনো অটুট রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে চলাচল করতে হবে। অর্থাৎ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আগের চেয়ে আরও প্রকাশ্য ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে একটি বড় ক্ষতি।

এর বাইরে ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবে যা চাওয়া হয়েছে, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। এই প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেওয়া। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবের সাধারণ কাঠামো মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত এই দাবি সরাসরি খ-ন করেনি। সামরিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের মূল উপাদান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর তেহরানের প্রভাবও বহাল তবিয়তে রয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছে, কিন্তু বাস্তবতা বলছে, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে এবং তাদের আঞ্চলিক প্রভাব সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

ঘরের ভেতরেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ এবং তার ব্যবহৃত ভাষা নিয়ে চারদিক থেকে চরম চাপে পড়েছেন। ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মারা যাবে’Ñএমন ভয়াবহ হুমকি দিয়ে তিনি শুধু বিরোধীদের নয়, বরং নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদেরও খেপিয়ে তুলেছেন। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা আরও একধাপ এগিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি অপসারণ দাবি করেছেন। বিশ্বের দৃষ্টিতে এই ক্ষতির মাত্রা আরও গভীর। একসময় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার রক্ষক হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই বৈশ্বিক শৃঙ্খলার ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে একটি দেশের পুরো সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন, ইতিহাসে এমন নজির নেই। এই ভাষা ও এই যুদ্ধ বিশ্বের বাকি দেশগুলো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে দেখবে, তা স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে। আপাতত যুদ্ধবিরতির ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে এবং শেয়ারবাজার চাঙা হয়েছে, কেবল এটুকু স্বস্তি মিলেছে। কিন্তু পরবর্তী দুই সপ্তাহের আলোচনা যে অত্যন্ত কঠিন হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইরানের দাবির দীর্ঘ তালিকা দেখলে সহজেই বোঝা যায়, এই যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য চোকানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখনো বাকি রয়েছে।

‘আল্লাহু আকবর ধ্বনি’ দিয়ে বিজয় উদ্যাপন: এদিকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ইরানের বিভিন্ন শহরে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নেমে ‘আল্লাহু আকবর ধ্বনি’ দিয়ে আনন্দ মিছিল করতে দেখা গেছে। রাজধানী তেহরানসহ একাধিক এলাকায় মানুষ পতাকা হাতে উদ্যাপন করে এবং স্লোগান দেয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করে একে ‘বিজয়ের মুহূর্ত’ হিসেবে তুলে ধরছে। ইরান সরকারও এটিকে শাসকগোষ্ঠীর বড় সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রকাশিত বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধে ইরান তার প্রায় সব লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং প্রতিপক্ষ একটি ঐতিহাসিক ব্যর্থতার মুখে পড়েছে।

প্রেসিডেন্টের অপসারণ দাবিতে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র :

যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মাঠ মোটেও শান্ত হয়নি। বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া ভাষায় দেয়া হুমকিকে কেন্দ্র করে তাকে অভিশংসন বা অপসারণের দাবি এখন তুঙ্গে। ডেমোক্র্যাট নেতাদের পাশাপাশি খোদ রিপাবলিকান শিবিরের কিছু নেতা এবং ট্রাম্পের সাবেক সহযোগীরাও এই দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। নেতাদের দাবি, একটি প্রাচীন সভ্যতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়ার যে প্রচ্ছন্ন হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা তার পদের অযোগ্যতাকেই প্রমাণ করে। আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং এড মার্কির মতো প্রভাবশালী রাজনীতিকরা সাফ জানিয়েছেন, জাতীয় ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে কংগ্রেস অথবা ক্যাবিনেটকে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের মতে, এটি কেবল রাজনৈতিক বিরোধ নয়, বরং বিশ্বের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।

এদিকে, যুদ্ধবিরতিকে ‘লোকদেখানো’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্পের অবিলম্বে অপসারণের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন যুদ্ধবিরোধী হাজারো আন্দোলনকারী। বিক্ষোভকারীদের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ চলমান সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং তিনি গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এক চরম ‘হুমকি’। আন্দোলনকারীরা বলছেন, ট্রাম্পের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। ‘নো কিংস’ আন্দোলনের ব্যানারে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন যে, ট্রাম্প যতক্ষণ ক্ষমতায় আছেন, ততক্ষণ শান্তি অধরাই থেকে যাবে।

যে ১০ শর্তে যুদ্ধবিরতি : ইরানের সরকারি গণমাধ্যমে শর্ত ১০টি তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: ইরান ও তার মিত্রদের ওপর পুনরায় হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকা, ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে বাধা প্রদান না করা, ইরানের ওপর থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সব সম্পদ ও সম্পত্তি অবিলম্বে ফেরত প্রদান, ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তোলা সকল প্রস্তাব বাতিল করা, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রস্তাবগুলোও বাতিল করা, ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং লেবানন সহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।

ইরানের গণমাধ্যমের দাবি করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্ত মেনে নিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সেটি নিশ্চিত করেনি। তবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে উভয়পক্ষ যে একমত হয়েছে, সেটি নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি। সেইসঙ্গে, ইউরোনিয়াম সমৃদ্ধ করলেও সেটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রতিবদ্ধ হয়েছে তেহরান। ইরানে এখন পর্যন্ত যতটুকু পরমাণু সমৃদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলো ‘যথোপযুক্তভাবে সেগুলো দেখভালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে চীনও ভূমিকা রেখেছে বলে জানতে পেরেছেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি, চীনকে জামিনদার হিসেবে চায় ইরান : মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চীনকে অন্যতম ‘নিরাপত্তা জামিনদার’ বা গ্যারান্টর হিসেবে দেখতে চায় ইরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যদি চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে বা আবারো বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তার ফল অত্যন্ত ভয়াবহ হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। গতকাল বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানি রাষ্ট্রদূত আব্দুর রেজা রহমানি ফাজলি এসব কথা বলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর দুই সপ্তাহের জন্য বোমাবর্ষণ স্থগিত করার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই এই প্রতিক্রিয়া জানালো তেহরান। সংবাদ সম্মেলনে ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমরা চাই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলো এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান ও তুরস্ক একযোগে কাজ করুক। যাতে তারা নিশ্চিত করতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র আর নতুন করে যুদ্ধ শুরু করবে না।” তিনি চীন ও রাশিয়াকে ইরানের ‘প্রকৃত বন্ধু’ হিসেবেও অভিহিত করেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ‘শোচনীয় পরাজয়’ হয়েছে : ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা দাবি করেছেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ‘শোচনীয় পরাজয়’ বরণ করেছে। গতকাল স্পুতনিক রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর ‘বিনা উসকানিতে একপাক্ষিক ও আগ্রাসী হামলা’ চালিয়েছে। তার ভাষায়, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং সংঘাতের মাত্রা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাড়িয়েছে।

মারিয়া জাখারোভা আরও উল্লেখ করেন, সংঘাতের শুরু থেকেই রাশিয়া এই হামলার বিরোধিতা করে আসছে। প্রথম প্রতিক্রিয়াতেই মস্কো স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, এই ধরনের সামরিক আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন এবং এটি কোনোভাবেই টেকসই সমাধান বয়ে আনতে পারে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির কোনো সামরিক সমাধান নেই। বরং কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সংলাপের মাধ্যমেই এই সংকট নিরসন সম্ভব। রাশিয়ার মতে, সামরিক উত্তেজনা বাড়ানো হলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সূত্র : আল-জাজিরা, রয়টার্স, ডেইলি সাবাহ, ডন, টিওআই।