

বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল তারাই ফের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে নতুন করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
তিনি বগুড়ার ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে বিএনপি আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসেই শুরুতে যখন নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে ঠিক সেই মুহুর্তে বিরোধী দল সংসদের ভেতরে এবং বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে নানান ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, অতিত দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। ৮৬ সালের নির্বাচনে তারা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। ৯৬ সালেও তারা স্বৈরাচারকে সাথে নিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল। ২০০৮ সালে ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সাথেও জোট বেঁধে গণতন্ত্রের বিরোধী শক্তির সহযোগী হয়েছিল। তাদের যড়যন্ত্রের ধরণ দেখে মনে হয় ৫ আগষ্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের ভূত বিরোধী দলের ঘাড়ে চেপেছে। তাই তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে দেশের মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) বিকেলে বগুড়ার ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, বিগত ১৬ বছর দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা এবং ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার সাথে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।
তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকার মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে মেগা দূর্নীতি করেছে। লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমরা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে দেশটাকে নতুন করে সাজানোর কাজ শুরু করেছি। নির্বাচনের আগে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যেই ফ্যামলী কার্ড, কৃষি কার্ড এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ করেছি। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের ধর্মগুরুদের সম্মানী দিয়েছি। সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কাজ শুরু হয়েছে। স্বল্প খরচে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানীর জন্য বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা চলছে। অচিরেই সুখবর আসবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া জাতির সামনে সংষ্কার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। পরবর্তীতে আমরা জাতির সামনে ৩১ দফা সংষ্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছি। অন্তর্বর্তী সরকার সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে বিএনপি সেটাতে সবার আগে স্বাক্ষর করেছে।
আমরা যেই সনদে স্বাক্ষর করেছি সেই সনদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করবো। আমরা বারবার এই কথাটি পরিস্কার ভাবে বলার পরেও কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যারা জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তারা নারীর উন্নয়ণ, নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কোন কথা বলেনা। মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কথা বলেনা। কিভাবে প্রশাসনকে ঠিক করতে হবে সেই কথা বলেনা। তারা শুধু জুলাই সনদ নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়। তিনি বলেন, আমরা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি। আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। ৮৬ সালের নির্বাচনে তারা দেশর মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। ৯৬ সালেও তারা স্বৈরাচারের সাথে নিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল। ২০০৮ সালে ওয়ানন ইলেভেনের সাথে যোগ দিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল। তিনি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে বগুড়াবাসীর দীর্গ দিনের দাবী বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সরাসরি রেল লাইন নির্মাণ কাজ শিঘ্রই শুরুর ঘোষনা দেন। সেই সাথে বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানীর সুবিধার্থে বগুড়া বিমান বন্দরে কার্গো বিমান চলাচলের ব্যবস্তা করবেন বলেও ঘোষনা দেন। পাশাপাশি বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং সেখানে কৃষিসহ বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি চালুর প্রতিশ্রুতি দেন।
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর পত্নী ডা: জোবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
জনসভায় স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। এরপর তারেক রহমান বাইতুর রহমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদের পূণ:নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।
এরপর বগুড়া প্রেসক্লাব এর বহুতল ভবনের উদ্বোধন করেন।
এর আগে তিনি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সড়ক পথে বগুড়া সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছেন। বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান সার্কিট হাউজে প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। একই সাথে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা: জোবাইদা রহমানকেও ফুল দিয়ে বরণ করে জেলা প্রশাসন। এসময় বগুড়া শহরের প্রবেশমুখ বনানী হতে সাতমাথা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মি প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায়।
প্রধানমন্ত্রী এসময় হাত নেড়ে তাদের অভিনন্দনের জবাব দেন। প্রধানমন্ত্রী সফরের প্রথম কর্মসূচি হিসেবে বেলা ১১টায় বগুড়া বার সমিতির নবনির্মিত বহুতল ভবনের নাম ফলক উন্মোচন করেন। এরপর তিনি বগুড়াসহ ৭ জেলায় ই-বেলবন্ড কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা, সংষদ সদস্যবৃন্দ এবং জেলা প্রশাসকের কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
ই-বেল বন্ড কার্যক্রম উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির পর দেশে জনগণের সরাসরি ভোটে দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণ তাদের হারানো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার ফেরত পেয়েছে।
তিনি বলেছেন, আর কখনো যাতে কোনো স্বৈরাচার কিংবা তাবেদার জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারে সেটি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। সে লক্ষেই বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে।এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডাঃ জুবাইদা রহমান ও আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে বগুড়াসহ সাত জেলায় এ ই-বেইলবন্ড সিস্টেম চালু হলো।
তিনি বলেন, আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় করে দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের সুফল মিলবে না। সামাজিক ভারসাম্য, সমতা এবং অধিকার নিশ্চিত করতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম উপাদান। যা মূলত নৈতিকতা, আইন এবং মানুষের প্রাপ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি মৌলিক দিক। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছিলেন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারকদের ভূমিকাই মুখ্য। এ কারণে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে হরণ করা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দ্বার
উন্মোচন করে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিচারবিভাগকে দলীয় আদালতে পরিণত করা হয়েছিল। আইনের দোহাই দিয়ে শাসন চালালেও তখন দেশে ‘ন্যায়বিচার’ ছিলো না দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ অন্ধকারের শাসন থেকে মুক্তি পায়। সুতরাং, বর্তমান সরকার এবার দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর।
তিনি বলেন, আদালত হয়রানির জায়গা নয় বরং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিরাপদ স্থল-জনমনে এমন বিশ্বাস দৃঢ় হলে সমাজ থেকে ‘মব ভায়োলেন্স’ও দূর হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।
এ জন্য বর্তমান সরকার ‘ন্যায় এবং আস্থার’ জায়গা হিসেবে বিচার বিভাগকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় জনগণের হয়রানি লাঘব করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বিচার, প্রশাসন ও বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের অংশ হিসেবে বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নে ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি বাস্তবায়ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে। দেশের সকল আদালতে ই-বেইলবন্ড পদ্ধতি চালু করা গেলে জনগণের বিচারপ্রাপ্তিতে বিলম্ব ও বৈষম্য দূর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আইনের শাসন এবং ন্যায় বিচার, বিষয় দুটি একটি আরেকটির পরিপূরক। আমার কাছে মনে হয় রাষ্ট্রে আইনের শাসনই শেষ কথা নয় বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র এবং সমাজে আইনানুগ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক।আমি মনে করি, জামিন প্রক্রিয়ায় ই-বেইলবন্ড ব্যবস্থা বিচারপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যাত্রা পথে একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ। ‘ইলেক্ট্রনিক জামিননামা’ বা ই-বেইলবন্ড পদ্ধতির মাধ্যমে অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই জামিননামা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যাওয়ার ফলে বিচার প্রার্থীদের হয়রানি লাঘব হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আগে একটি জামিননামা সম্পন্ন করতে আদালত থেকে জেলখানায় পৌঁছানো পর্যন্ত আইনজীবী, মুহুরি, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, পিয়নসহ নানা পরিক্রমায় কমপক্ষে ১৩টি ধাপ পার হতে হতো। ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি চালুর পর এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে জামিননামা কিছু সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে। এ কারণে বর্তমান সরকার সারাদেশের সকল আদালতকে ই-বেইলবন্ড পদ্ধতির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এরই অংশ হিসেবে আজ থেকে বগুড়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া এ কয়টি জেলায় আদালতের কার্যক্রমে ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি চালু হলো। এর ফলে জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তির কারামুক্তির ক্ষেত্রে হয়রানি লাঘব হবে। অপরদিকে বিরোধীপক্ষ কিংবা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের তৎপরতা কিংবা জামিননামা জালিয়াতির ঘটনার সুযোগও কমে যাবে।
তিনি বলেন, একজন বিচারক যেহেতু জামিন আদেশটি যাচাই করে সরাসরি অনলাইনেই কারা প্রশাসনের কাছে পাঠাবেন সেহেতু কারা প্রশাসন জামিন আদেশ পাওয়ার সাথে সাথেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারা মুক্তি দিতে সক্ষম হবেন। ফলে ই-বেইলবন্ড বা ইলেক্ট্রনিক জামিননামা ব্যবস্থা বিচার ব্যবস্থায় জনগণের অহেতুক হয়রানি এবং দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে।
তিনি বলেন, ই-বেইলবন্ড সিস্টেমকে পুলিশের সিডিএমএস, আদালতের কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং ন্যাশনাল আইডি কার্ড ভেরিফিকেশনের সাথে যুক্ত করার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। জনদুর্ভোগ কমাতে বিচার ব্যবস্থার পুরো প্রক্রিয়াকেই বর্তমান সরকার কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের আওতায় এনে এর আধুনিকীকরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার বিচার ব্যবস্থায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট, রিলিজ অর্ডার এবং থানা থেকে ওয়ারেন্ট রিকলের কাজ সম্পন্ন করবে। এটি করা সম্ভব হলে এক জেলার অভিযুক্ত আসামি অন্য জেলায় গ্রেপ্তার হলে অনলাইনে দ্রুত ‘উপনথি’ প্রেরণের মাধ্যমে জামিন শুনানি সহজ করা হবে। ফলে পুলিশি হয়রানি ও ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বন্দি করে রাখার যে অপসংস্কৃতি, তা উৎপাটন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, শুধু প্রযুক্তির উন্নয়নই নয়, আমরা মানসিকতারও উন্নয়ন চাই। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেই বিচার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রী, পুলিশ কিংবা কর্মকর্তা এবং একজন সাধারণ নাগরিকের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকবে না। বিচার বিভাগ থাকবে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অনবদ্য পাদপীঠ। আমি বিশ্বাস করি, ‘এক্সেস টু জাস্টিস ফর অল’। ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা করুণার বিষয় নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার-উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই ডিজিটাল উদ্যোগ সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে একটি বিশাল মাইলফলক। আমি আইন মন্ত্রণালয়, কারা কর্তৃপক্ষ এবং এই সিস্টেমের নেপথ্যে কাজ করা সকল আইটি বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষ করে আইনজীবী ও বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, আপনারা এই প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ করে বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। এদিকে জেলখানায় কমপক্ষে ৩০ শতাংশ মানুষ অকারণে কিংবা টাকার অভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে না পারায় বছরের পর বছর বিনাবিচারে জেলে থাকতে বাধ্য হচ্ছে জানিয়ে এ ব্যাপারে কি করা যায় সেটি খতিয়ে দেখতে তিনি আইনমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের ফলক উন্মোচন করেছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় পৌর ভবনে তিনি এ ফলক উন্মোচন করেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড়শ বছর পর বগুড়া পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনের মর্যাদা পেল। এটি দেশের ১৩ তম সিটি কর্পোরেশন।
ফলক উন্মোচন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের অনেকদিনের দাবি ছিল, সেটি পূরণ হলো।
বগুড়া সিটি কর্পোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করলো। বগুড়াকে একটি মডেল টাউনে পরিণত করার যে দাবি তা সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আপনাদের সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।’ অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বগুড়া সদর (বগুড়া-৬) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল হাসান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সেখানে গাছের চারাও রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় ৯১১ জনের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার দুপুরে উপজেলার বাগবাড়ীতে শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে এ কার্ড বিতরণ করেন সরকারপ্রধান।
অনুষ্ঠানে বিএনপির দলীয় সঙ্গীত ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ পরিবেশন করা হয়। এ সময় দাঁড়িয়ে কণ্ঠ মেলান প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। এতে শামিল হন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। সমর্থকরাও দাঁড়িয়ে কণ্ঠ মেলান।
নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে পরিবারের জীবনমানের উন্নয়নে বিএনপি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে গত ১০ মার্চ ঢাকায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান। পরীক্ষামূলকভাবে আগামী জুন মাসের মধ্যে ১৪টি উপজেলায় ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। এর আওতায় প্রতিটি পরিবার মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাবে। পরিবারে মা অথবা নারী প্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করবে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এই কার্ডকে সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ডে রূপান্তর করা হবে।
এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়ায় হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। গাবতলীর বাগবাড়ীতে জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে সোমবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে সরকারপ্রধান এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
আরো উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, বিএনপির মিডিয়া সেলের বর্তমান আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিলটন প্রমুখ। প্রধানমন্ত্রী শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান কর্মসূচিকে সরকারের অন্যতম সফল উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে। জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় নারী-পুরুষ, শিশুদের অভিভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমানের পিতৃভূমি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার বেলা পৌনে ৪টার দিকে নশিপুরে সরকার প্রধান কোদাল দিয়ে মাটি কেটে চৌকিদহ খালের খনন কার্যক্রমের সূচনা করেন।
এ সময় বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোরশেদ মিলটন, জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান, কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু উপস্থিত ছিলেন।
আপনার মতামত লিখুন :